জুলাই বনাম মুক্তিযুদ্ধের প্রলপন
'২৪ জুলাই আমার জন্য অনেক দিক দিয়ে শিক্ষনীয় ছিলো। আমি তথাকথিত "মুক্তিযুদ্ধ" দেখিনি। কিন্তু আমি '২৪ জুলাই দেখেছি। সেই দেখায় আমার মধ্যে '২৪ ও '৭১ এর একটা সমান্তরাল ইতিহাসের বোধ তৈরী হয়েছে। যেমন ধরুন ৫ আগস্ট দুপুরের আগ পর্যন্ত আমরা সাধারণ নাগরিকেরা যেমন বুঝতে পারিনি যে সত্য সত্যই আওমী মাফিয়া শাসনের বিলুপ্তি হতে যাচ্ছে তেমনি ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্তও কেউ ধারণাই করতে পারেনি যে পূর্ব-পাকিস্তান সত্য সত্যি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই কথা আমি বহু জনের মুখে শুনেছি। কিন্তু তখনও তা উপলব্ধি করতে পারিনি। কেননা জানা আর উপলব্ধি করবার মধ্যে পার্থক্য আছে। হয়তো এই ঘটনা কে (phenomen) এভাবেও প্রকাশ করা যায় যে এই অঞ্চলের রাজনীতি ও মানুষের মন এর আবহাওয়ার মতোই স্বত:পরিবর্তনশীল। জুলাইয়ের আরেকটি শিক্ষা হলো সংগ্রামের ন্যায্যতার সাথে তার বয়ানের সংগতির একটা সম্পর্ক রয়েছে। যে কারনে জুলাই হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যায় রুপান্তরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় নি। এর পক্ষে বৈধতা উৎপদানের জন্য লাশের রাজনীতিও করা লাগেনি। সরকারী হিসেবে শুনলাম ছ-সাতশ জন তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের হিসেবে বোধহয় পনেরোশ এর মতো। আমি ধারণা করি যে প্রকৃত সংখ্যাটি বড়ো জোর তার চার-পাঁচ গুনের বেশী কিছুতেই হবে না। অর্থাৎ মনে করেন সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার নিহত। আর তালিকাভুক্ত আহত এর সংখ্যা-ই তো শুনলাম অর্ধ লক্ষের এর মতো। কিন্তু এর বিপরীতে একাত্তুরের নিহতদের নিয়ে যে অপরাজনীতি ইতিহাস পূর্ব (pre hisotry) সময় থেকে চলে আসছে অদ্যবধি তা শেষ হয় নাই। হবেও না। কেননা এটাই তার বৈধতার প্রধান হাতিয়ার। তা না হলে আজ পর্যন্ত তার একটি তালিক হলো না কেনো। তিরিশ বছর পর যে তালিকা হয়েছিলো তার সংখ্যার সাথে আওমী ও মুক্তিযুদ্ধপন্থীদের প্রচার-প্রপাগান্ডার এতো ফারাক কেনো? তবে আমার মতে এই হিসেবটি-ই সবচেয়ে বেশী বাস্তব সম্মত। কেননা জুলাইয়ের প্রকৃত নিহতের সংখ্যার মতো যদি একে চার-পাঁচ গুনও বর্ধিত করি তাহলে শর্মিলা বোসের দাবীকৃত তিরিশ-চল্লিশ হাজারের সংখ্যাটাই প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে অবাঙ্গালী কজন? নাকি শুধু বাঙ্গালী মরলেই শহীদ হয়? যে হিন্দুটি বিলাতী মেমদের বোমা মেরে সন্ত্রাসবাদে লিপ্ত হয়েছিলো তাকে বানানো হয়েছে শহীদ। আর যে মাওলানার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের জন্য উপস্থাপিত হিন্দু সাক্ষী-টি মাওলানার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার আশংকায় গুমের শিকার হয়েছিলো সেই মাওলানাকে বানানো হলো মানবতা বিরোধী। ইদানীং অনেকে জুলাইয়ের "ব্যর্থ বিপ্লব" নিয়ে হা-হুতাশ করেন। একে তাকে দায়ী করেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো মুক্তিযুদ্ধের প্রবঞ্চকরাই জুলাইয়ের মূল প্রতিপক্ষ। এজন্যই তথাকথিত বিপ্লব উত্তর উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের পর পরই আমরা বলেছিলাম পুরানা পাপী নতুন দরবেশ হিসেবে হাজির হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত দুই বছরে আমাদের আশংকা সত্যে পরিণত হয়েছে। বাঙ্গালীর কি আশ্চর্য ভেদবুদ্ধি যে সে বিপ্লব করে গণভোটের মাধ্যমে তার বৈধতা খোঁজে! বিপ্লবোত্তর পরাজিত শক্তিবর্গকে সে বিপ্লবের অভিযাত্রী করে নেয়। বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি ধ্বংসের কারিগরদের দিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে চায়। যে পরিচালক স্ক্রীপ্ট ও কাহিনী ছাড়া নাট-সিনেমা নির্মাণ করে দেশের বিনোদন জগতের অধ:পতন ঘটিয়েছে, অশ্লীলতাই যাদের কাছে সৃজনশীলতা, তাকে দেয়া হয়েছিলো বিপ্লবোত্তর সংস্কৃতি নির্মাণের দায়িত্ব। অর্থাৎ নিজের নাকট-সিনেমায় ভাষা দান করবার যোগ্যতা যেই ব্যক্তির নাই বিপ্লবোত্তর পুরো দেশের মুখে খৈ ফোটাবার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছিলো সেই মূকের ওপর। যে ব্যাটা দেশকে রাজনীতিশূন্য করবার ষঢ়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো, যার তত্ত্বাবধানে দেশের নাগরিকদের বায়োমেট্টিক তথ্য হাতিয়ে নেয়া হয়েছিলো, যার সুরক্ষা দিতে তারা হয়েছিলো ব্যর্থ, যে দেশে জেরিমেন্ডারিং (Gerrymandering) করে ইলেশন ইঞ্জিনিয়ারিং-কে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছিলো বিপ্লবোত্তর সরকারে নেয়া হয়েছিলো তাকেও। কাজেই জুলাইয়ের এই পরিণতি আশ্চর্যের নয়। এবং এটাই চলবে যাবৎ বাংলাদেশে মানুষ লড়াই-টা বুঝতে সক্ষম হচ্ছে। এই লড়াই যে ঈমান বিল কুফরের লড়াই তা আজ পর্যন্ত-ও দেশের একটা বড়ো সংখ্যক উপলব্ধি করেনি। যদিও তারা নামে মুসলমান। এই লড়াই-টা আপনারা বুঝবেন যখন দেখবেন যে জুলাই হত্যাযজ্ঞের অস্বীকারকারীদের আইনগত প্রতিবিধানের দাবীটি তেমন জোরালো ভাবে আসে না। কারন এর প্রয়োজন নেই। খোদ এই খুনী রাষ্ট্র্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে সে কমসে কম তার ছ থেকে সাতশ নাগরিককে হত্যা করেছে। সূর্যালোক অস্বীকারকারীদের মানুষ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেনা। বিকারগ্রস্থ হিসেবই দেখে। কিন্তু একাত্তুরে "গণহত্যার" অস্বীকারকারীদের আইনগত প্রতিবিধানের দাবীটি কিন্তু বরাবরই জোরালো ছিলো। কেননা তা প্রমাণিত নয়। নয় বলেই আইন দিয়ে, প্রতিষ্ঠান দিয়ে, রাষ্ট্র্যীয় উকিল-মোক্তার, পাইক-পেয়াদা দিয়ে তার সত্যতা জোর করে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কেননা এ নিয়ে যতো উন্মুক্ত চর্চা হবে ততোই এই বয়ান দিগম্বর হতে থাকবে। আর মিথ্যা-ই কুফরী অক্ষশক্তির প্রধান অবলম্বন। ঈমান আর কুফরের লড়াই-টা যদি বোঝেন তাহলে বুঝবেন আমরা কেন বলেছিলাম যে গুম-খুন হাসিনার মুল অপরাধ ছিলোনা। হাসিনার মুল অপরাধ ছিলো শাসন ব্যর্থতা। কেননা গুম-খুন ন্যায়বান শাসকেরাও করেন। করতে বাধ্য হন। এটা আদর্শনীয় (ideal) নয় অবশ্যই। এটা তার অক্ষমতার বহি:প্রকাশ-ও বটে। কিন্তু এটাই বাস্তব। ভর জলসায় বিচার-আদালত প্রতিষ্ঠা শাসকের সার্বভৌমত্বের বার্তা দেয়। কিন্তু বান্দার সার্বভৌমত্ব না স্থায়ী, না নিরঙ্কুশ, না অপরিবর্তনীয়। একটা পর্যায়ে সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে হলেও তাকে একটা অস্থির সময় একটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কাজেই হাসিনার ও গুন্ডারা গুম-খুন করেছিলো এটা মূল সমস্যা নয়। বরং কাদের গুম-খুন করেছিলো তা দেখলেই তার অন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যখন হাসিনা লে: কর্ণেল হাসিন-কে গুম করেন কাজের মেয়ের বার্মিজ প্রেমিকের কথোপকথনের জেরে, যখন বিগ্রেডিয়ার আযমী কিংবা ব্যারিস্টার আরমানের মতো নিরীহ লোকদের গুম করা হয়, যখন গুম-খুনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী ও দুষ্ট নাগরিকদের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক কায়কারবার ও ক্ষমতার বলয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন সেই গুম-খুনকে কোন বিচারেই ন্যায্য সাব্যস্ত করবার সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ যদিও এটা রাষ্ট্র্যের আদর্শ কর্মপদ্ধতি হতে পারে না তথাপি কাকে গুম করা হচ্ছে তা দেখে অন্যায্যতার সীমা সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করা যায়। যাক কথায় কথা বাড়ে। ঐ যে বললাম মূর্খদের অসংগত চিন্তা খন্ডনের প্রচেষ্টা তাদের মধ্যে আরও অধিক প্রশ্ন ও অসংগতির জন্ম দেয়। এই পার্থক্য-টা বুঝজ্ঞানের। এটা অনতিক্রম্য।