আবুজর গিফারীর পথ
জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব নাম ছিলো জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। কিন্তু আবেগ-অনুভূতির উর্দ্ধে উঠে মিলিটারী সমর্থিত হুদা-সাখাওয়াত গং পিআলো-দিল্লী স্টারের উসকানীতে জামায়াতে ইসলামী ও মোটা দাগে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে আদা-জল খেয়ে নামে। তখন তারা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী করতে বাধ্য করে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ফার্স্ট বিষয়টাই একটা ইসলাম বিরোধী প্রকল্প। কিন্তু তাদের এই ইসলামী বিরোধী প্রকল্প সেখানেই শেষ হয় নাই। বরং আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমে জামায়াতের যে সাংগঠনিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিলো তাকেও তারা বদলে দিতে বাধ্য করেছিলো। এর মধ্য দিয়ে শুধু ঐ দুই কুলাঙ্গারই নয় বরং তাদের পেছন থেকে যে মিলিটারী সর্বতোক্রমে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছিলো তারাও নিজেদের তাগুতি শক্তি অর্থাৎ ইসলাম বিরোধী শক্তি হিসেবে দ্ব্যর্থহীনভাবে উপস্থাপিত করেছিলো। আর আজ দুই যুগেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত হবার পর বাংলাদেশে কুফর ও শেরেকের আঁতুড় ঘর আওমী জঠরে লালিত-পালিত সেনাপ্রধানের মুখে শুনতে হচ্ছে যে দেশ নাকি বেদাতে ভরে গিয়েছে। তিনি নামাজ-রোজার মতো আমাদের প্রাত্যহিক ধর্মীয় আচার সমূহেও বেদাত খুঁজে বেড়াচ্ছেন (১)। মূলত এটাই বাংলাদেশ। আমাদের মাওলানা রহ: সাহেব বলেছিলেন যে এক মদ্যপ কোথাও কোন হুজুরের ওয়াজ শুনেছিলো যে পানি খাবার সময় গোঁফে লাগলে তা মাকরুহ হয়ে যায়। এখন সে মদের গ্লাস হাতে নিয়ে পাশের লোককে জিজ্ঞেস করছে, ভাই আমি যদি সতর্কতার সাথে গোঁফ উচা কইরা এমন ভাবে খাই যাতে পানি না লাগে তাহলেও কি মাকরুহ হবে? অর্থাৎ সে খাচ্ছে হারাম কিন্তু মাকরুহ নিয়া সে বিরাট চিন্তিত। এসব দেখেই বড়ো হয়ে এসেছি। সুদের টাকায় বেড়ে ওঠা আম্রিকা বিরুদি আওমী-বামাতির পয়দা গুলো এক সময় পাশ্চাত্যের ঝাঁ চককচকে শহরের প্রলোভন সামলাতে না পেরে বিদেশ পাড়ি জমায়। কিন্তু সহসাই সে উপলব্ধি করে যে তার চৌদ্দগুষ্ঠির হালাল-হারাম টাকা একত্র করলেও পাশ্চাত্যের বড়ো শহরগুলোতে একটা বাড়ী কেনার মর্টগেজ জোগাড় হবে না। তাছাড়া পাশ্চাত্য সোনার বাংলার মতো "সিস্টেম" করে চলেনা বিধায় সেখানে তার নবাব হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কমই। তখন সে গল্প ফাঁদে যে সুদের টাকা থেকে বাঁচার জন্যই সে বাড়ী-গাড়ী করছেনা। সেতো দুনিয়া বিরাগী একশো তের চল্লিশ গ্রেডের পীর সাপ। দ্বীনকে ভালোবেসেই তার কাফেরের দেশে যাওয়া। এটাই চিরায়ত বাঙ্গালীয়ানা। যাকে কোন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা অসম্ভব। কোন ব্যাকরণের ছকে তাকে বাসানো অসম্ভব। সে বাঙ্গালী। সে না হিন্দু, না মুসলিম, না বৌদ্ধ, না খৃস্টান। সে বকচ্ছপ মূর্তি। সে সব খানেই আছে। আবার কিছুতেই নেই। দুই নৌকাতেই সে পা দিয়ে রাখে। যদিও সে না ঘরকা, না ঘাটকা। তার একমাত্র পরিচয় সে বাঙ্গালী। তথাপি এই অনর্থের দেশে মাওলানা রহ: সাহেবের ওয়াজ শুনে আমাদের মতো কিছু তরুন ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিলো। মাওলানা সাঈদী সাহেব যদি তাঁর বাগ্মীতায় আমাদের বশীভূত করে থাকেন তবে মাওলানা মওদূদী রহ: বশীভূত করেছেন তাঁর লেখনীতে। আমরা একটা বোধগম্য, সাযুজ্যপূর্ণ জীবন-দর্শনের খোঁজ পেয়ে হয়েছিলাম যারপরনাই আত্মহারা। কিন্তু মানুষে আর কেতাবে ফারাক থাকে বরাবর-ই। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই। অন্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে কেনো? তারপরও ব্যাকরণ থাকে। কারন তা আদর্শ। মান। তার দাঁড়ি-কমার অলিগলি পেরুবার সময় কখনও কখনও টেরাফিক ছিংগাল মিস হয়ে গেলেও মোটা দাগে তার ছাঁচে পড়ে আমাদের বক্তব্য পরিশীলিত হয়ে ওঠে। যা হয় তাতেই লাভ। কেতাবী জ্ঞানের এই সার। কিন্তু মানবীয় দূর্বলতা এক বিষয় আর চরিত্রগত-বুঝজ্ঞানগত দৈন্যতা আরেক বিষয়। কৈশর থেকে জামাত-শিবির-কে এ যাবৎ যতোদুর চিনেছি তাতে ঘুরে ফিরে কেন জানি মনে হয় যে তার মধ্যে ইসলামের চাইতে বাঙ্গালীয়ানাই বেশী প্রবল। আর বাঙ্গালীকে যতোদূর চিনেছি আমার মনে হয়েছে যে এরা ঠিক মানুষের পর্যায়ে কখনোই উত্তীর্ণ হতে পারবে না। সেই সক্ষমতাটাই তার নাই। যুগে যুগে যখনই কোন জাতির উত্থান হয়েছে তখন তার মধ্যে এক জাতীয় নৈতিকতাবোধ কাজ করেছে। এক জাতীয় জীবন-দশর্নগত প্রবল বিশ্বাস কাজ করেছে। যে নৈতিকতা, যে বিশ্বাসের জন্য সে প্রানপাত করতে পর্যন্ত প্রস্তুত ছিলো। কিন্তু বাঙ্গালীর সংগ্রাম বরাবরই সাতই মার্চে চেগিয়ে উঠে পঁচিশে মার্চের রাইতে স্যুটকেস গুছিয়ে ফেলায় পর্যবসিত হয়েছে। তার কর্মকান্ডে মনে হয়না সে শেকড়বদ্ধ। বরং ফুটবলের মতো এক খেলোয়াড় থেকে আরেক খেলোয়াড়ের পায়ে গিয়ে সে ছিটকে পড়ে। কাজেই যদিও জামায়াতে ইসলামীর রাজসিক ত্বত্তে দিশা খুঁজে পাওয়াটাই ছিলো স্বাভাবিক, তাদের নিয়ে আশায় বুক বাঁধাটাই ছিলো স্বাভাবিক। তথাপি তার প্রভাব ময়দানে আশানুরুপভাবে দৃশ্যমান হয়নাই। জামাত-শিবিরের কর্মকান্ড ও তার রাজসিক রাজনৈতিক ত্বত্তবের এই ফারাকটিকে মানবীয় দূর্বলতা জনিত বলেও ভাববার ফুসরত কম। বরং তা বাঙ্গালীয়ানা জনিত। বংশপরম্পরায় খোদ জামাতের উদরে জন্ম নেওয়া নষ্টগুলো জনকন্ঠে হাত-পাকিয়ে জামাতের বিরুদ্ধেই শেষ পর্যন্ত নেয়ে খেয়ে লাগে। বুঝজ্ঞানহীন এই সব জাহিলদের সাথে দ্বীনে ফেরা হাফিজাউল্লুক পট্টির পার্থক্যটা ঠিক কোন জায়গায়? জামায়াতের সাথেও কি আদৌ জামাইত্যাদের কোন পার্থক্য আছে? না কি ঘুরে ফিরে সব বাঙ্গালী-ই? তাইতো? জামাতের রাহবারেরা দাবী করতেন যে একাত্তুরে ছেকুলাঙ্গারদের নেতৃত্বের কারনে তারা "মুক্তিযুদ্ধে" অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এরা সেই লোক যারা আবার বায়ান্নোর "বাসা" আন্দোলনের অগ্রনী মুজাহিদ। একান্নবুইতে ঠিক ছেকুলাঙ্গারদের সাথে মিলেই তাঁরা কেয়ারটেকার সরকারের মতো একটি অরাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে আন্দোলনে নামলেন। আর এখন তো ওনারা পারলে মোকতিজুদ্দের ছেপাহছালার হয়ে যান। বিএনপি যখন তাঁদের কাঁধে ভর করে সরকার বানায় তখন দুটো মন্ত্রণালয়ের হাড্ডি জামাতের প্রতি ছুঁড়ে দেয়। সেই মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণও ফুটবলের মতো ঘুরতে থাকে। কিন্তু জামাত যখন -নেতা আছে ভোট নাই, যে ভাবেই হোক ক্ষমতা চাই- পাট্টির সাথে জোট বাঁধেন তখন অন্যায্যভাবে তাদের নিজস্ব আসনগুলো-ও ছেড়ে দিতে হয়। সারা জীবন তাগুতি শক্তির কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে দ্বীন কায়েম করবার রাজনীতি করে এসে ক্ষমতায় আরোহণের প্রাক্কালে অন্যদের এগিয়ে দেয়ার মধ্যেই তাঁরা রাজনৈতিক হেকমত খুঁজে পান। আবার ক্ষমতা পাবার প্রশ্ন না থাকলেও একাত্তুরের চিহ্নিত গাদ্দারকেই পেছিডেম পদের জন্য নির্বাচিত করতে হয়, যে ছাব্বিশের নির্বাচনের আগেও নিজের দাম বাড়াতে জামাত নিয়ে বাজে বকেছিলো। নির্বাচিত হয়ে একটি মুসলিম রাষ্ট্র্য ভাঙ্গবার কারিগর সেই বেঈমানটি জাতির সাথে বেঈমানি না করবার পুন:প্রতিশ্রুতি দেয়। এছলামী জনতা হাঁ করে গিলে। মাথা নেড়ে, চিৎকার করে সায় জানায়। ঠেএএএক! অনেক হেকমত হয়, রাজনীতি হয়, হিসেব-নিকেষ হয়। সেই হিসেব-নিকেষের গ্যাড়াকলে পড়ে আশি বৎসর ধরে রাজনীতি করা দলটির কোন নেতা রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়া দুরে থাক, সেই পদের পক্ষে লড়াই করবার উপযুক্ত বলেও বিবেচিত হয় না। কেননা সেই পদ রাজাকার ও তাদের বশংবদ, পেছনে এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘোরা অর্ধমৃত দলদাস, ও বলিউডি নায়িকা প্রেমী চুরুটখোরদের জন্যই নির্ধারিত। মন্দ নয়। কথায় বলে কাউয়া চিনে ঘাউয়া আম। বাঙ্গালী বরাবর-ই কাউয়া। সমস্যা হলো আমরা যারা দ্বীন ইসলামের প্রতি ভালোবাসা থেকে জামায়াতের প্রতি ঝুঁকেছিলাম তাদেরকে বরাবর হতাশ-ই হতে হয়েছে। তাদের বিভ্রম-দোদুল্যমানতা আমাদেরকে ক্রমাগত বীতশ্রদ্ধ, ছন্নছাড়া, একাকী করে তুলবে। আবুজর গিফারীর মতো। যাঁর সম্পর্কে নবীজি সা: আফসোস করে বলেছিলেন: আবুজরের ওপর মহান আল্লাহর রহমত। সে একাকী-ই পথ চললো। একাকী-ই মৃত্যুবরণ করলো। একাকী-ই উত্থিত হলো। নবীজির ওফাত পরবর্তী ফিৎনা-ফাসাদে বিতৃষ্ণ হয়ে তিনি নির্জনবাসে একাকী-ই মৃত্যু বরণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যশয্যায় স্ত্রীর বিলাপ শুনে তিনি আস্বস্ত করলেন যে নবীজির প্রতিশ্রুতি ছিলো একদল মু'মিন তাঁর জানাজা পড়াবেন। কাজেই বিরান মরুভুমিতে তাঁর জানাজা পড়াবার জন্য একদল মু'মিনকে মহান আল্লাহ প্রেরণ করলেন। মহান আল্লাহ-ই প্রেরণ করেছিলেন। কেননা তাঁকে দাফন করবার কাপড়টুকুও না থাকায় উপস্থিত ব্যক্তিদের একজন কাপড় দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কেননা সেই ব্যক্তি কিছু সময় সরকারী চাকুরী করেছিলেন। তখন সেই ব্যক্তি আরজ করলেন যে এই কাপড়টি তার অর্থে খরিদ করা নয়। বরং তাঁর মায়ের থেকে উপহার প্রাপ্ত। তখন সেই কাপড়ে প্রখ্যাত সাহাবী আবুজর গিফারী রা: কে দাফন করা হয়। মৃত্যুপূর্বে তাঁর অসিয়ত ছিলো যে তিন শ্রেনীর লোক যেনো তাঁর জানাজা না পড়ে। মনে নাই। তবে এর মধ্যে এক শ্রেনী সরকারী চাকুরে। প্রশ্ন হলো এই ফেৎনার যুগে আমরা যদি আবুজর রা: এঁর মতো নির্জনবাসের সৌভাগ্যও অর্জনকরি, এই ধোন ছিলা মালাউনের দেশে আমাদের জানাজা পড়াবেটা কে? তাওয়াক্কালতু আলাইহি, ওয়া ইলাইহি মুনিব। তবে পেছিডেম পদের জন্য রাজাকারের বাচ্চা আর বিষ্ঠা মোক্তিজুদ্দার লড়াইটা আমরা উপভোগ করবো। ইতিপূর্বে বলিউডপ্রেমী এক চুরুটখোর পেছিডেম আমরা পেয়েছিলাম। শুনেছি সম্ভাব্য পেছিডেম বংশীয় সূত্রে ছিনেমা হলে মালিক। সেদিন এটুবে থাম্বনেইল দেখলাম তিনিও ইতিমধ্যে নায়ক মলমগীরের সাথে বিড়ি ফুঁকার গল্প ফেঁদে বসেছেন। মোকতিজুদ্দের চেতনার বানলাদের জন্য এরাই উপযুক্ত নেতা। এটাই মহান আল্লাহর বিচার। আমি খুশী। খুব খুশী।
১) ড. উমার ফারুক আবদ-আল্লাহ তাঁর শিক্ষকের বরাত দিয়ে বলছেন, কথায় কথায় বেদাত! বেদাত! বলাটাই একটা বেদাত!