বাংলা ভাষার দেউলিয়াত্ব
বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করবার পথে সবচেয়ে বড়ো দুটো চ্যালেঞ্জের একটি হলো ভাষাগত আরেকটি হলো বুঝজ্ঞানের তফাৎগত। বাংলা ভাষায় বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ইতিহাস খুব একটা গৌরবজ্জ্বল নয়। আমার মতে অন্তত বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বাংলা ভাষা অক্ষম। এই ভাষায় উচ্চমানের কাব্য ও সাহিত্য চর্চা হয়েছে সন্দেহ নেই। তবে তাও একটি নির্দিষ্ট ঘরানার। একটা নির্দিষ্ট ধাঁচের। খুব একটা বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়। আর বর্তমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সভ্যতার চাহিদা মেটানো বাংলা ভাষার পক্ষে সম্ভব নয়। এর একটা প্রধান কারন হলো এই ভাষায় জ্ঞান কিংবা প্রযুক্তির কোনটিই উৎপাদন হয় না। কাজেই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বিদেশী ভাষা সমূহ বিশেষ করে ইংরেজীর ওপরই প্রধানত নির্ভরশীল। আমেরিকান পন্ডিতদের লেখা পড়লে মনে হয় যেনো এই কথাটাই, ঠিক এই চিন্তাটাই আমাদের মাথায় এতোদিন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। যা ভাষার দুর্বলতার কারনে প্রকাশ করতে আমরা ছিলাম অক্ষম। তারওপর বিদেশী পরিভাষা সমূহের বাংলা ভাষান্তর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো কাজ করে। যদিবা আপনি কোনমতে একটা ভাষান্তর করতে সক্ষমও হন তথাপি আপনার ভাষাভাষীরা সেটা বুঝবে না। কারন কেবল ভাষার ট্রান্সলেশনের (translation) মাধ্যমেই চিন্তার ট্রান্সমিশন (transmission) হয় না (১)। এর জন্য প্রয়োজন একটি সাধারন (common) চিন্তার মাধ্যম। কিংবা চিন্তা কাঠামো (thought paradigm)। Shared struggle, shared history - যা মানুষের ভাবনাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। তাদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য (unity of thoughts) তৈরী হয়। এ কারনে দেখা যায় যে ইংরেজী ভাষায় আমরা যেভাবে আমাদের চিন্তার স্বত:স্ফূর্ত প্রকাশ ঘটাতে পারি সেভাবে বাংলাতে পারিনা। অথচ বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, ইংরেজী নয়। এমনও বহু অভিজ্ঞতা আছে যে নিজের চিন্তার আলোকে একটি নতুন ইংরেজী শব্দ বা শব্দগুচ্ছ তৈরী করেছি যা পরবর্তীতে প্রখ্যাত লেখকদের লেখায় খুঁজে পেয়েছি। এটাই কি বাংলার চাইতে ইংরেজী ভাষার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণবাহী নয়? যাহোক ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্বে আলোচনা এখানে উদ্দিষ্ট নয়। বরং বাংলা ভাষার নিশ্চলতা (rigidity) ও যুগের অনুপোযোগীতা তুলে ধরাই এর উদ্দিষ্ট। বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার দ্বিতীয় প্রধান সমস্যাটি হলো বাংলাদের বুঝজ্ঞানগত দেউলিয়াত্ব। অর্থাৎ এদের শুধু যে জ্ঞানের অভাব আছে তা-ই নয়, বরং এদের বুঝেরও অভাব আছে প্রকটভাবে। যে কারনে এদের মধ্যে যে যতো বেশী পড়ালেখা করে সে সাধারণত ততো বেশী বিভ্রান্ত হয় এবং বিভ্রান্তিকর কথা ও চিন্তাভাবনার সংক্রমণ করে। তাছাড়া কেউ যদি শুদ্ধ ও মৌলিক জ্ঞান দান করতে প্রবৃত্ত তখন এই বুঝজ্ঞানগত ফারাকের জন্য তা সাধারণের মধ্যে আরও অধিক বিভ্রাট উৎপাদন করে। প্রতিটি যথার্থ উত্তর একাধিক উদ্ভট প্রশ্নের অবতারণা করে।
(১) অন্যভাবে বললে ভাষান্তর সব সময় ভাবের সঞ্চার ঘটাতে পারে না।