রাজনীতির প্রকারভেদ

আমরা যে রাজনীতি দেখে, শুনে, বা পড়ে বড়ো হয়েছি তাকে মোটা দাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। কিংগলি পলিটিকস (১)। সংগ্রামের রাজনীতি। বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি। বস্তিপট্টির রাজনীতি।

তুরস্কের যুগান্তকারী নেতা এরদোগানের রাজনীতিকে কিংগলি পলিটিকস বলা যায়। একে ইসলামের সুলতানী-বাদশাহী আমলের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কিংবা উত্তরাধিকারীও বলা যায়। মুসলমানদের কিংগলি পলিটিকস এর মৌল ভিত্তি হলো ইসলামী মানস। কিন্তু এর সাথে ইসলামিস্ট বা ইসলামবাদি রাজনীতির মূল পার্থক্যটা বোধহয় ত্বত্তগত বাঁধাহীনতায়। একজন রাজনৈতিক তাঁর রাজনীতিকে ত্বত্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার মধ্য দিয়ে তাঁর শত্রুদের নিকট তাঁর বিজয়যাত্রার ছক ফাঁস করে দেন। শত্রুরা তখন হিসেব কষে তাঁর যাত্রা পথের দূর্বলতম জায়গা গুলোতে ফাঁদ পেতে তাকে সহজে ধরাশয়ী করতে পারে। একজন কিংগলি পলিটিশিয়ান অবশ্যই নীতিবান কিন্তু কোনভাবেই ইডিওলজিক (২) নন।

এই যে চব্বিশ উত্তর মুহতারামে আমীরে জামাত আওয়ামীদের ক্ষমা করে দেবার ঘোষণা দিয়ে তীব্র জনরোষের শিকার হলেন এটাকে আমি ইডিওলজিক রাজনীতির কুফল হিসেবই দেখি। কেননা এই নীতি আল-উস্তাদ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা রহ: এঁর ঘোষিত নীতি। এখানে বর্তমান আমিরে জামাত এর বদলে অন্য কেউ থাকলেও তাঁকেও এই কথাই বলতে হতো। একে অবশ্য অন্যভাবে দেখবার সুযোগ-ও আছে। যেমন একটি কাজ কিভাবে করা হয় তার ওপর অনেক সময় তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে। ক্ষমা করবেন ভালো কথা। কিন্তু সে ঘোষণা দেবার একটা উপযুক্ত সময় ও প্রেক্ষাপট থাকা চাই। এ কারনেই তখন অনেকেই যথার্থ প্রশ্ন তুলেছিলো এই বলে যে আওমীরা কি ক্ষমা চেয়েছে? তার ওপর এ কথাটি বারংবার বলায় তার গুরুত্বটি হারিয়ে যায়।

তা না করেও অবশ্য তাদের উপায় ছিলোনা। কেনোনা মিডিয়া তাদের কোন কথাই প্রচার হতে দেয় না। যদিও বা দেয় তা বিকৃত করে। ধরেন জামাত যদি নির্বাচন পূর্ব কাদিয়ানী সম্মেলনে যোগ না দিয়ে আমাদের চাওয়ামতো শুধু একটি মিডিয়া ভাষ্য দিতো তখন সেই মিডিয়া ভাষ্যের বিষয়টি জনগণের সামনে না আসলেও জামাত যে কাদিয়ানী হয়ে গেছে এইটা নিয়ে খুব বস্তিপট্টির রাজনীতি হতো। এখন বাংলাদের তো আর এতো বুদ্ধি নেই উল্টো প্রশ্ন করবে যে যেই জামাত কওমী পট্টিদের হিসেবে কাদিয়ানীদের চাইতে নিকৃষ্ট তার জন্য কাদিয়ানীদের স্তরে উঠে আসাটাও একধরনের উত্তরণ নয়কি?

আরও আছে। জামাত মক্কা বিজয়ের ন্যায়ে তাদের ওপর কৃত প্রতিপক্ষের সকল জুলুমের ওপর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার কথা প্রচার করতে পারলেও এই কথা তারা প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছে যে মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও কয়েকজনকে বিচার পূর্বক মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিলো। এর মধ্য দিয়েই সাধারণ ক্ষমার সীমা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিলো।

অবশ্য জামাত শুধু এ বিষয়েই নয় বরং তাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্ববাহী অনেক বিষয়কেই খোলাসা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন ধরুন জামাত-শিবিরের সম্পর্কের বিষয়টি। তাদের সাথে মেলামেশার সময় এই বিষয়ে কথা উঠলে ওনাদের গৎবাঁধা জবাব ছিলো অনেকটা এরকম যে জামাত আর শিবিরের মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই। তারা দুইটা আলাদা সংগঠন। শুনে আমি চদু হয়ে যেতাম। বলে কি! শিবিরের সব প্রোগ্রামে জামাতের নেতারা আসেন। জামাতের রাজনৈতিক কর্মসূচী মূলত শিবির-ই বাস্তবায়ন করে। তাইলে ক্যাম্নেকি?

আমি বলি ক্যাম্নেকি। জামাত আর শিবিরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একই। শিবির জামাতের সহযোগী সংগঠন হলেও লেজুড়বৃত্তিক সংগঠন নয়। শিবির ও জামাতের কাঠামোটাই এমন যে জামাতের কোন নেতার পক্ষে সাংগঠনিক ভাবে শিবিরের প্রতি হুকুম-নির্দেশনা জারি করা সম্ভব নয়। তথাপি জামাত থেকেই শিবিরের জন্ম। তরুণদের কর্মচাঞ্চল্য ও উদ্দীপনার বিষয়টি লক্ষ্য করেই এক পর্যায়ে জামাতের তরুন ছাত্রদের নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সংগঠন করা হয়েছিলো। তাকে পর্যাপ্ত স্বাধীনতাও দেয়া হয়েছে যাতে তার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলীসমূহ গড়ে উঠতে পারে।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে শিবির যা চায় তা-ই করতে পারবে। আমাদের সময়ও প্রায়শ একটা ছাগল মার্কা কথা শুনতাম যা এখনও চাউর আছে। আর তা হলো শিবির কেনো নির্বাচনে আসে না? বা শিবির কেনো জামাত থেকে পৃথক হয়ে নিজের আলাদা রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে হাজির হয় না। এইটা হতে পেরেছে এই কারনে যে জামাত-শিবিরের অনেক নেতারাই নবীনদের অসংগত সাংগঠনিক ধ্যাণ-ধারণা দিয়ে গড়ে তোলেন। যে তুমি কিন্তু কলি খুব শাদিম! তুমি যদি আইজ বাদে কাইল চাও বামাতি রাজনীতির পথ ধরবা সেইটা তুমার বিবেচনা। জামাত এতে হস্তক্ষেপ করবে না। হেঁ হেঁ হেঁ। দন বলেছো বাইয়া। সে-ই হয়েছে!

এই প্রশিক্ষণগত দূর্বলতা ও চিন্তাগত অসংগতির প্রভাব এতো সূদুর প্রসারী যে বেশ কয়েকবার শিবির জামাত থেকে স্বাধীন হতে যেয়ে ধরা খেয়েছিলো। এখনও মাঝে মাঝে সেই শাদিম চেতনা চেগিয়ে ওঠে। জামাত সাদিক কায়েমকে মেয়র নির্বাচনের জন্য মনোনীত করেছে বলে চাউর হলো। শিবির বিবৃতি দিলো সাদিক কায়েমের জন্য একটা জায়েজ নাই! হারাম। হারাম। হারাম।

খুব শাদিম-সংগম হইলো। আর এদেশের জনগনও কিন্তু এসব খুব খায়। ঐ যে আছে না নেতা হেঁটে যাচ্ছেন। জনগন ওয়াও! নেত্রী পেদে দিচ্ছেন। জনগণ বিস্মিত! তাহলে নেতানেত্রীরাও আমাদের মতোই হাঁটেন? পাদেন? ঐ যে বিপ্লবী শ্লোগান আছে না -

তুমিও পাদো, আমিও পদি,
বামের পাদও বামবাদী।

ভিত্রে ভিত্রে সবাই পাদে এই সত্য আবিষ্কার করে বস্তিপট্টিতে খুশীর জোয়ার বয়ে যায়। কেননা সরকারী চাকুরী কিংবা হারাম ব্যবসা করে জাতে উঠলেও তাদের মধ্যে সবসময় একটা হীনমন্যতা কাজ করে। কারন সে জানে সে বস্তির মাল। বারো ভাতারির পয়দা। এজন্য কারনে-অকারনে সে লেনলঠ, ফিল মার্শাল হাবিলদার, আমি এম নট ইওর ছারবেন, ইউ নু মি? হাউ ডেঁয়ার ইউ! ইত্যাদি করে বেড়ায়।

কিন্তু যখন সে দেখে যে চৌধুরী সাহেবের পোলা মেট্টিক ফেল খুশীতে তখন তার দাঁত বেরিয়ে যায়। মিঞাঁ বাড়ীর মেয়ে ডেরাইবারের লগে ভাইগা গেছে এইটা নিয়ে সে খুব তাফালিং করে বেড়ায়। সমাজের এ কি অবস্তা বেবে দেকো দিকি! কারন সম্ভ্রান্ত-ধার্মিকজন বলে পরিচিত শ্রেনীর যতো অপমান হয়, অধ:পতন হয় ততোই সে তাদেরকে নিজের সাথে তুলনা করতে পারে। জামায়াতের এমপিও তলে তলে ...। হেঁ হেঁ হেঁ। সে অডিও-বিডু সহ নেডে সেরে দেয়। হেঁ হেঁ হেঁ। ঘুরে ফিরে সবাই যে তার মতোই পাদে এইটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরে সে নিজের জন্মের সার্থকতা খুঁজে পায়। এটাই বস্তিপট্টির রাজনীতি।

শিবিরের সাথে জামাতের সম্পর্কের বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য উপায়ে উপস্থাপনে ব্যর্থতার মতো আরেকটি ব্যর্থতা হলো একাত্তুরে তাদের ভূমিকার বিষয়টির উপস্থাপন। এর কারনও আছে। একাত্তুরোত্তর যে হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে তাতে এই বিষয়ে তার মধ্যে একটা স্থায়ী ভীতি তৈরী হয়েছে। স্টকহোম সিনড্রোম। আর এটা মুক্তিযুদ্ধের অরাজনৈতিকতার আরেকটি প্রমাণও বটে। কেননা রাজনৈতিক কর্মসূচীর যৌক্তিকতা সহিংসতা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। হতে পারেনা। মুক্তিযোদ্ধারা সেই চেষ্টাও করেনি। এজন্য তারা এ যাবৎ ঢোল পিটিয়েই বলে এসেছে যে গণতান্ত্রিক কিংবা শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে "স্বাধীনতা" অর্জিত হয়নি। বরং তা অর্জিত হয়েছে সশস্ত্র পন্থায়। আর এটাই সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা। অর্থাৎ রাজনৈতিক অধিকার আদায় করবার জন্য সহিংসতার আশ্রয় গ্রহণ (৩)।

জামায়াত শুধু যে একাত্তুরে তাদের অবস্থানের যৌক্তিক, রাজনৈতিক, ও আইনগতভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছে তা-ই নয়, বরং তারা সেকুলারদের বয়ান গ্রহণ করে এই সম্পর্কিত আলোচনা লেজেগোবরে করে ফেলেছে। আমি তাদের বহু লোককে সেকুলারদের মতো এমনও বলতে শুনেছি যে ওয়ান ম্যান'স টেররিস্ট, এনাদার ম্যান'স ফ্রীডম ফাইটার। এটা যে কতো পাতলা কথা, কতো উদ্ভট কথা, কতো অসংগত কথা, কতো অনৈসলামিক কথা তা এরা বুঝলো না। সেকুলারবাদের অসারতা প্রমাণের জন্য এই এক কথাই যথেষ্ট। কেননা এতেই সার্বজনীন নৈতিকতার খন্ডন হয়ে যায়। জঙ্গলের আইনের ভিত্তি তৈরী হয়ে যায়। অথচ কুরআনের পরিভাষাগুলো কতো সুস্পষ্ট! কোরআনের সংজ্ঞায় যে জালিম সে মুসলিম হলেও জালিম, অমুসলিম হলেও জালিম। ফাসাদ সৃষ্টিকারীর ক্ষেত্রেও তদ্রুপ। সীমালঙ্ঘনকারীর ক্ষেত্রেও তদ্রুপ। কেননা সীমাটা কুরআনই নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এবং বারংবার তার সংজ্ঞায়িত সীমা ছাড়া আর সকল সীমার মৌল ভিত্তি খন্ডন করছে।

এবার আসি বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিতে। উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামের রাজনৈতিক অভ্যূদয় ঘটেছিলো মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি চর্চার মধ্যে দিয়ে। সাইয়্যেদ আবুল আ'লা নিজেই বলেছেন যে তিনি ইসলামী আন্দোলন তত্ত্বের ধারণাটি পেয়েছিলেন আল-জিহাদ ফিল ইসলাম রচনার সময়। অর্থাৎ জিহাদ নিয়ে গবেষণার সময়। অবশ্য এও সত্য যে জিহাদ নিয়ে অন্যরাও গবেষণা করেছেন। কিন্তু মাওলানার মতো এরকম একটা রাজসিক রাজনৈতিক তত্ত্ব খুব কম লোকই উপস্থাপন করতে পেরেছে। পাকিস্তান জামাত মূলত সেই রাজনীতির চর্চাই এতোদিন যাবৎ করে এসেছে। যদিও হালে তাদের রাজনৈতিক মেজাজে পরিবর্তণ এসেছে বলে মনে হচ্ছে। মূলত সেই বিষয়েই আজকে কলম ধরা। পরে আসছি।

বাংলাদেশে এসে জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি হয়ে গিয়েছে সংগ্রামের রাজনীতি। এটা খুব সচেতন ভাবে ঘটেনি বলেই আমার ধারণা। বরং এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির মেজাজ, চরিত্র। বাংলাদেশের মানুষের দুটি প্রধান জাতিগত বৈশিষ্ট্য হলো কামড়াকামড়ি এবং কান্নাকাটি। এজন্য তার সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কার্যকলাপে এই দুটি বিষয়ই প্রাধান্য পায়। মনে করেন বহু দেশে বিয়েতে বরযাত্রী থেকে শিশুদের উপঢৌকন গ্রহণের একটা রীতি চালু আছ। কিন্তু বাংলাদেশে এসে এটা একটা কুৎসিত রুপ ধারণ করেছে। এ নিয়ে রাতারাতি কন্যা ও বর পক্ষের মধ্যে ঠেলাঠেলি, ধ্বস্তাধস্তি পর্যন্ত হয়। এরপর খানার আয়োজন সহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে কামড়াকামড়ি করে ক্লান্ত হবার পর আসে কান্নাকাটির পালা। এক্ষেত্রে পাত্রীপক্ষই প্রধান ভূমিকা পালন করেন। বাংলা সিনেমা দেখুন। একই ক্রীপ্ট। টকশো দেখুন। একই স্ক্রীপ্ট। সুতরাং রাজনীতি আলাদা হবে কেনো?

মজার ঘটনা হলো এই রাজনীতিতে গা ভাসিয়েই এই দেশে জামাত জনপ্রিয়তা পেয়ে গিয়েছে। কাশ্মীর কেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে সেদেশের জামাতের ভূমিকায় আমার মনে হলো তারা যেনো বাংলাদেশ জামাতের পদাংক অনুসরণ করতে চাচ্ছেন। তাদের মধ্যে এই চলটা অবশ্য দেখে এসেছি ইমরান খান সাহেবের গ্রেপ্তারের পর থেকেই। কামড়াকামড়ি ও কান্নাকাটিতে উপমহাদেশের মানুষদের মধ্যে একধরনের সাযুজ্য আছে। উপরন্তু আবেগ নির্ভরতায় ও তার প্রকাশের ক্ষেত্রে গোটা এশিয়াতে বিশেষত চীন, জাপান, কোরিয়ায় এক ধরনের মিল রয়েছে।

যদি সত্যিই আমার ধারণা সঠিক হয় তাহলে তা পশ্চিম পাকিস্তান জামায়াতের রাজনীতির একটি যুগসন্ধিক্ষণ। কেননা আমার বুঝ মতে সাইয়্যেদ আবুল আ'লার রাজনীতি ছিলো ইসলামের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি এলেম কেন্দ্রিক রাজনীতি। ইসলামের ইতিহাসের প্রসিদ্ধ প্রায় সকলকেই দেখবেন দ্বীনি সংস্কার কেন্দ্রিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষমতা কাঠামোতেও তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যেমন আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের ওপর ইমাম মালিক রহ: এর অনেক প্রভাব ছিলো। আহলে বাইতদের ওপর ইমাম আবু হানিফা রহ: এঁর বিরাট প্রভাব ছিলো। সালাহউদ্দিন আইয়্যুবির জন্ম হয়েছিলো বড়পীর জিলানী রহ: ও হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি রহ: এঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতায়। এমনকি হালের এরদোগান সাহেবও গড়ে উঠেছেন ইমাম-খতীব শিক্ষা ব্যবস্থার বদৌলতে। যা তুরস্কে ইসলামী পুনর্জাগরনবাদী নেতা সাইয়্যেদ নুরসীর মাদ্রাসা (ধর্মীয় শিক্ষা) ও মক্তবের (সেকুলার পেশাগত শিক্ষা) মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা। তদ্রুপ ইরানের ওপর খোমেনীর, সৌদির ওপর আব্দুল ওয়াহহাবের, কাতারের ওপর ইউসুফ কারযাভির প্রভাব সুপ্রসিদ্ধ।

প্রশ্ন হলো দ্বীনি এলেম কেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজ-রাজড়াদের ওপর প্রভাব বিস্তারের যে ইসলামী ঐতিহ্যবাহী রাজনীতি তার থেকে সরে গিয়ে রাজপথের সংগ্রাম কেন্দ্রিক, সংঘর্ষবাদী রাজনীতি আদপে পাকিস্তানের জন্য কতোটুকু সুফল বয়ে আনবে। কেননা পাকিস্তান একটি জটিল রাষ্ট্র্য। এর সেনাবাহিনী ধার্মিক ও দেশপ্রেমিক হলেও কম লোভী নয়। তার চাইতে আপত্তিকর বিষয় হলো এর ক্ষমতালিপ্সা। যার কারনে অদ্যবধি পাকিস্তান একটি সিভিল রাষ্ট্র্যে পরিণত হতে পারেনি। তা অবশ্য হালের তুরষ্ক, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ, ও ইরান ছাড়া আর কোন মুসলিম রাষ্ট্র্য-ই পারেনি। মূলত অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র্যের ভিত্তি-ই এখনও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এর মধ্যে সংঘাত মুখর রাজনীতি জনপ্রিয়তা বাড়ালেও আখেরে কি ফল দেয় সেটাই এখন বিবেচ্য।

(১) এডি এনরেজিতেই কতি হবে। রাজার রাজনীতি বললে ঠিক ভাব আসে না। প্রাসাদ রাজনীতি বললে ষড়যন্ত্রমূলক একটা ভাব চলে আসে। ক্ষমতার রাজনীতি বলাটাও ভূল। কেননা ওটা পাওয়ার পলিটিকস। মাস্তানীর রাজনীতি। এইটা কি বস্তু আমি নিজেও চিন্তা করে ঠাহর কত্তে পারি নাই। তবে এই বস্তিপট্টির দেশের লোকেরা কথায় কথায় পাওয়ার পলিটিস করে। যে মাদারির পুতেরা অফিসার হয়ে যায় তারা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে সাধারণ নাগরিককে হুমকি দেয়। সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখির সব ইসকিন ছট তার নেয়া আছে। রেবের অফিসার তার শালার দুলাভাই। দেবো? ফোন দেবো? এই মাদারীর বাচ্চাদের ক্ষমতায়নের জন্যই দেশটা দুর্বল রয়ে গেলো।

(২) এর বাংলা ভাষান্তর হলো আদর্শবাদী। এটা ভ্রান্তিমূলক। কেননা বাংলাতে শুনলে মানুষে মনে এর সম্পর্কে একটা ভালো ধারনা তৈরী হয়। কিন্তু পাশ্চাত্যে ইডিওলজি শব্দটি একটি মন্দ আবহ বহন করে। ফরাসি বিপ্লবোত্তর নানাপদের ধ্যান-ধারণা ও আন্দোলন সমূহ যে ভয়াবহ ফেৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি করেছিলো ইডিওলজি ঠিক সেই পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটকেই নির্দেশ করে।

(৩) এইটা আসলে গণহত্যার মতোই এই খাপছাড়া ভাবে সংজ্ঞায়িত (loosely defined) পরিভাষা। যার যথেচ্ছ ব্যবহার সম্ভব। আর এ কারনেই আমি পাশ্চাত্যের সেকুলার পরিভাষার বদলে ইসলামী পরিভাষার ব্যবহারে আগ্রহী বেশী। জালিমূন। ফাসিকূন। মুজরিমূন। প্রভৃতি।

Popular posts from this blog

The Politics of Funeral

বামাতি রাজনীতি থেকে উৎসারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে প্রলপন