আকলমান্দকে লিয়ে ইশারাই কাফি

কথায় বলে যার নয় বছরে আক্কেল হয়না তার নব্বুই বছরেও আক্কেল হয়না। ইউএস-ইরান যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে তাদের শাসক শ্রেনীর একটা পুরো স্তর উড়ে গিয়েছে। তথাপি কিছু আরবদের ধারণা এগুলো সবই মঞ্চস্থ নাটক মাত্র। যে আরব শাসককুল কদিন আগেও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকরণের নিমিত্তে প্রকাশ্য দহরম-মহরমে লিপ্ত ছিলো, এব্রাহাম একর্ড সহ রিয়াদে মাগী পার্টির আয়োজন করেছিলো তাদের ঘেঁটুপুত্রেরাই এখন ইরানের সাথে জায়নবাদীদের গুপ্ত ছলাকলার রগরগে গল্প ফাঁদায় ব্যস্ত। সন্দেহ নেই ইরানের সাথে ইউএসের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির। অর্থাৎ প্রকাশ্য ঘটনাবলীর আলোকে পর্দার আড়ালে কৃত দেনদরবারের ধারণা করা অত্যন্ত দুরুহ। কিন্তু তাই বলে সবকিছুতে ষঢ়যন্ত্রতত্ত্ব আবিষ্কার করে বসাটা ব্যক্তি বিশেষের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈণতা বৈ তো কিছু নয়। সিরিয়ায় ডিসেম্বর'২৪ এর বিপ্লবের পর ইরানের প্যান-ইসলামিক মুখোশ খসে পড়ে তার সাম্প্রদায়িক কুৎসিত চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে। আমরা দেখেছি বিপ্লবের পরও বিগত দু দুটো বৎসর হেজবুল্লাহ কিভাবে সিরিয়ার ভেতর অপতৎপরতা জারী রেখেছে। আমরা দেখেছি ইরান কিভাবে সিরিয়ায় অনবরত ফিৎনা-ফাসাদ উস্কে দিয়ে এসেছে। অথছ এর বিপরীতে সিরিয়ান বিপ্লবী সরকারকে ইরানের প্রতি খড়গহস্ত হতে দেখা যায়নি। যে ইরান বিগত বারোটি বৎসর যাবৎ সিরিয়ার গণহত্যায় প্রত্যক্ষ অংশীদার ছিলো, যে ইরান পাকিস্তান-আফগানিস্তান থেকে হাযারাদের ধরে নিয়ে "ফাতেমীয়্যুন" বিগ্রেড গঠন করে দামিস্ক, হালাব, দ্বার'আ - সহ সিরিয়ার সর্বত্র জন ঘন তাত্ত্বিক (demographic change) পরিবর্তনে লিপ্ত ছিলো সেই ইরানের দিকে বন্দুক তাক করা দুরে থাক ইরানের প্রভাব বলয়াধীন লেবাননে পর্যন্ত সিরিয়ান বিপ্লবী সরকার আমেরিকার সহযোগীতায় হেযবুল্লাহর বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার উপলব্ধি হলো লেখালেখির মাধ্যমে যতো তত্ত্বকথার ফুলঝুরি ফুটাই না কেনো সিরিয়ানদের মতো এহেন গণহত্যার শিকারে পরিণত হলে তার প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে নিজেকে সংবরণ করতে পারতাম কিনা সেই বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। একারনেই সিরিয়ান বিপ্লবী সরকারের কর্মকান্ড আমাদের মুগ্ধ করেছে। করেছে বিস্মিত। শিখিয়েছে ঢের। সিরিয়ার তরুন বিপ্লবী নেতা বলেছেন বিপ্লবের মানস দিয়ে সরকার পরিচালনা করা যায়না। কাজেই তিনি যে এখন প্রয়োজনে হেজবুল্লাহর সাথে বসে নিজেদের মধ্যকার বিবাদ মিটিয়ে ফেলবার ইরাদা ব্যক্ত করেছেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নাই। স্মরণ করুন এই সেই ইরান যারা যুক্তরাষ্ট্র্যের তৈরী করা ফাসাদের সুযোগে একদিকে আরবের সর্বত্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামায় লিপ্ত ছিলো অপরদিকে তারা শিয়া-সুন্নী ভাই-ভাই শ্লোগান চাউর করে সুন্নীদের ভুলিয়ে রাখতে ছিলো সচেষ্ট। এটা কাদিয়ানীদের লাভ ফর অল, হেইট ফর নান কিংবা ল্যাংটা গান্ধীর অহিংসবাদের ছোরার মতো মিছরির ছুরি নয়তো আর কি? কাজেই বল এখন ইরানের কোর্টে। সিরিয়ার মহান বিপ্লবীরা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তাদের খুনীদের সাথেও বসবার ইরাদা ব্যক্ত করে তাদের সাহসিকতারই জানান দিয়েছে কেবল। এখন দেখার পালা "জায়নবাদী", "ওহাবী", "টেররিস্টদের" এই আহ্বানে ইরানের কি প্রতিক্রিয়া হয়। সন্দেহ নেই যে ওহাবীবাদ তথা নজদীবাদ এবং বামাতি বাথিস্ট থেকে রাতারাতি দ্বীনে ফেরা ছালাফিদের শিয়া বিদ্বেষ চর্চা ও বাগাড়ম্বর ইরানী রাষ্ট্র্য ও সমাজের সহনশীল অংশটিকেও অতংকিত এবং যুদ্ধংদেহী করে তুলেছিলো। বস্তুত একটি রাষ্ট্র্য যদি মতবাদীও (ideological) হয় তথাপি তার স্টেক হোল্ডারদের মধ্যেও থাকে বৈচিত্র্য। সবাই এক রকমের হয়না। কাজেই নজবীবাদী সৌদী রাষ্ট্র্য যেমন একাহারী নয় তেমনি "ইসলামী বিপ্লবোত্তর" ইরানও কেবল একাঙ্গিক চিন্তার সমষ্টি নয়। তবে মাত্রার হেরফের থাকে। সৌদি যতোটা নজদী, ইরান ততোটা শিয়াবাদী নয় বলেই ধারণা করি। কেননা সৌদী রাষ্ট্র্যের গোড়াপত্তন হয়েছে নজদীদের দ্বারা। পক্ষান্তরে ইরানের ইসলামী বিপ্লবে বামাতিদেরও অংশগ্রহণ ছিলো। কালক্রমে তাতে এক অংশের প্রভাব ছাপিয়ে অপর অংশ সামনে এসেছে। অর্থাৎ বাথিস্ট ও নাজদীদের মোকাবেলায় সাম্প্রদায়িক শিয়াবাদী ও ইরানী জাতীয়তাবাদী-সাফাভিদের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরী হয়ে তারা সুন্নী বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। যার কূটকৌশলে ইরাকি বাথিস্টরা পরাজিত হয়ে শিয়া বিরোধী সালাফি রুপ পরিগ্রহ করেছে। অথছ শিয়াবিদ্বেষ সালাফিবাদের ভিত্তিমূলক বৈশিষ্ট্য (foundational characteristics) নয়। বরং তার ভিত্তিমূলক বৈশিষ্ট্য ছিলো উদারতাবাদ (liberalism)। কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে সালাফিদের অসহিষ্ণু ও শিয়া বিদ্বেষী রুপটাই প্রচার পেয়ে গেলো। এর বাহিরেও যে অনেক পদের সালাফীবাদের অনুসারী আছেন তাদের চিন্তা ঢাকা পড়ে গেলো। তদ্রুপ শিয়াবাদী ও ইরানী জাতিয়তাবাদী ছাড়াও ইরানের অন্য যে সকল স্টেক হোল্ডার আছেন, বিশেষ করে যারা প্রকৃত অর্থে ইখওয়ান বা জামায়াতের মতো প্যান-ইসলামিস্ট তারাও নজদী-রাফিদি কিংবা বাথিস্ট-সাফাভি দ্বন্দ্বে পড়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেলেন। সাধারণ মুসলমান এ প্রত্যাশা করতেই পারে যে সিরিয়ান বিপ্লবীদের এহেন সাহসী আহবানে ইরানের প্যান-ইসলামিস্টরা সাড়া দেবেন। যদি তা সফল হয় তাহলে তা এক ভূকম্প (seismic wave) তৈরী করবে সন্দেহ নেই। কারন আমার ধারণায় তখন মুসলিম বিশ্বে বিজাতীয়-কুফরী আধিপত্যবাদের তল্পিবাহক, অরাজনৈতিক কিংবা অপরাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক-সামরিক শক্তিগুলো হুমকির মুখে পড়বে। সেই হিসেবে এটা অবিশ্বাস্য নয় যে বিগত দিনে জায়নবাদীদের সাথে হাত মিলিয়ে স্বৈরশাসক সিসির সেনাবাহিনীর একাংশ ইরান সংলগ্ন আরব রাষ্ট্র্যগুলো থেকে গোপনে ইরানে হামলায় অংশ নিয়েছিলো। গতকাল আমরা দেখলাম যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় অংশ নেয়ার প্রোগ্রামে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের "প্রধানমন্ত্রীর" সাথে হাত মেলালেও তার পাশেই বুভুক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকা "ফিল্ড মার্শাল"-কে উপেক্ষা করেছেন। মুসলিম রাষ্ট্র্যসমূহের সভ্য (civil) হয়ে উঠবার যে জরুরত তার ইঙ্গিত এতে আছে বলে মনে করি। অপরদিকে আমেরিকা থেকে আসা ভারতের দুলাভাইটি আরাগচির সাথে ছবি তুলে, আসছে ভোটের ময়দানে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী কার্ড খেলবার যে ফন্দি আঁটছিলেন তা সফল না হওয়ায় খুব হতাশ। বিগত নির্বাচন পূর্বেও আমরা ট্রাম্পের এহেন চাতুর্য দেখেছিলাম। যে ট্রাম্প মিডিয়ার মিথ্যাচার উন্মোচন করে দিয়ে আমেরিকান রেডনেকদের (redneck) নিকট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি নিজেই যে একজন সবৈর্ব মিথ্যাবাদী তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। কাজেই নির্বাচন পূর্বে ট্রাম্প-ভেন্সের একযোগে ইসরায়েল কিংবা নেতানিয়াহুকে তুলোধুনো করবার অপকৌশল নতুন কিছুতো নয়। কিন্তু যেটা নতুন তা হলো আল-কায়েদার "ওহাবী", "সন্ত্রাসী"-দের দ্বারা ইরানের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। সত্যি বলতে কি এটাও তেমন নতুন নয়। কেননা আল-কায়েদার সাথে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বহু অমুসলিম রাষ্ট্র্যতো বটেই ইরানও যে একটা সমঝোতায় আসতে চেয়েছিলো এতো সাধারণ জ্ঞান। ইরানে ওমর বিন লাদেন সহ ওসামার পরিবারের অবস্থান কিংবা ব্ল্যাকমেইলিং যাই হোক এর একটা ইঙ্গিত তো আছে অবশ্যই। ইরানের প্যান-ইসলামিক স্টেক হোল্ডারগণ যদি সিরিয়ান বিপ্লবীদের এই আহ্বানে সাড়া দেন তাহলে তা বিগত কয়েক শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ঘটনা হবে বলে আমি মনে করি। ২০০৬ এর ইসরায়েল বনাম হিজবুল্লাহর যুদ্ধে বিরোচিত ভুমিকায় মুসলিম বিশ্বে হাসান নাসরাল্লাহ সহ ইরানের যে অবস্থান তৈরী হয়েছিলো সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তার পুরোটাই নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই এটা ইরানের জন্য এক মহাসুযোগ। আমরা দেখেছি কদিন আগে তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোগান ইরানী প্রেসিডেন্ট পেজেকশিয়ানকে সালাম জানিয়েছিলেন। ইশারা দিয়েছিলেন কবিতার মাধ্যমে। ইরানী প্রেসিডেন্ট-ও সালামের উত্তর দিয়েছেন। যে নজদী-রাফিদি কাউয়া-কাতাড়িতে উম্মতে মোহাম্মদী ত্যক্ত-বিরক্ত সেই নজদী রাজা ইরানের প্রাক্তন ধর্মীয় নেতা খামেনীকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। যার সারবস্তু আজও অজানা। তদ্রুপ বিগত দিনের নজদী-উসমানীয় তিক্ততা ভুলে গিয়ে নতুন নতুন সামরিক জোট হবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ইরানের লাগাম যদি প্যান-ইসলামিস্টদের হাতে যায় তাহলে অচিরেই মুসলিম উম্মাহ ভিত্তিক একটি বৃহত্তর জোট আমরা হয়তো দেখতে পাবো। সন্দেহ নেই যে এতে উম্মতের ভেতরে-বাহিরে অনেকের ক্ষতি আছে। সন্দেহ নেই যে নজদী-উসমানী তিক্ততা কিংবা উসমানী-সাফাভি তিক্ততার একটা ঐতিহাসিক প্রভাব ও গুরুত্ব আছে যা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। তারওপর রয়েছে জাতীয় স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী সমূহ এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন। কদিন আগেকার ইউঐস-চীন বৈঠককেও অনেকে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার একটা বোঝাপড়া হিসেবে দেখতে চেয়েছেন যেখানে তারা নিজেরা যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়বার বিষয়ে ঐক্যমত্য হয়েছে। অর্থাৎ তারা একে অপরের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাষ্ট্রসমূহকে লেলিয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক বলয়ে নিজেদের শক্তি কাঠামোর মূল্য নির্ধারণ করবে। এ অবস্থায় মুসলিম বিশ্ব যদি একটা উপরি ঐক্যমতেও পৌঁছতে পারে তা তাদের ওপর বিগত কয়েক শতক ধরে চেপে বসা বিজাতীয় কুফরী আধিপত্যের মূল উৎপাটন করবে এই বিষয়ে অন্তত: আমার মনে কোন সন্দেহ নাই।

Popular posts from this blog

The Politics of Funeral

বামাতি রাজনীতি থেকে উৎসারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে প্রলপন