পরমতসহিষ্ণুতা

পরমত অসহিষ্ণুতার ব্যাপারে আমার সহোদর-সহপাঠীদের অভিযোগ বেশ পুরোনো। প্রথমে আমলে নিতাম না। কারন অন্যকে, অন্যের মতকে আমি যে আসলেই তুচ্ছজ্ঞান করিনা সে ব্যাপারে আমার ভেতর একধরনের প্রতীতি ছিলো। কিন্তু বেশকয়েকবার এমন অভিযোগ পাওয়ার পর আমার উপলব্ধি হলো যে এরা সবাই ভুল আর কেবল আমি সঠিক এমন হবার সম্ভাবনা কমই। তখন এ নিয়ে আমি চিন্তা-ভাবনা শুরু করলাম। আমার উপলব্ধি হলো যে জোশ-জজবার সাথে আমি নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই এবং অন্যের মতকে খন্ডন করতে চাই নিশ্চই সেখান থেকেই এই ভুল ধারণার প্রতিষ্ঠা। আমি বিতার্কিক নই। তর্ক করা পছন্দ-ও করিনা। বাংলাদেশে ইশকুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বাচাল-বেয়াদব বানাবার অনেক প্রক্রিয়া আছে। তার একটার নাম অন্ত: কিংবা আন্ত: ইশকুল বিতর্ক প্রতিযোগীতা। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। দেশের অনেক কিছুই বন্ধ হওয়া দরকার। আসলে ভারতের সাথে সংগম করে পাওয়া দেশটার পুরো বন্দোবস্ত-ই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। সে যাক। তর্ক আর আলোচনা এক নয়। কথায় বলে বিদ্বজ্জনের সভা হলে করে আলোচনা, মূর্খজনের পঞ্চায়েতে লাগে ঠনাঠনা। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেশের সংসদ। এ কারনেই জামায়াতে ইসলামীর লোক না হলে এখন আর কারোর-ই "বক্তিমার" ক্লিপ দেখার রুচি সাধারণত হয়না। তাও প্রায়শ হতাশ হতে হয়। তো বলছিলাম নিজের পরমত অসহিষ্ণুতার ব্যাপারে। আমি ভেবে দেখলাম আমার সবচেয়ে বড়ো দূর্বলতা হলো নিজের যৌক্তিক মানস। আমার উপলব্ধি হলো যে মানুষ মোটা দাগে যৌক্তিক হলেও যুক্তি সর্বস্ব নয়। যুক্তি দ্বারাই মানুষের সব কর্মকান্ড পরিচালিত হয় না। এছাড়াও যেসব উৎস মানুষের সিদ্ধান্ত ও কর্মকান্ডকে পরিচালিত করে তার সবগুলো যৌক্তিক তো নয়ই, নৈতিকও নয়। কেননা প্রায়শই সে বিভ্রান্তিতে (blunder) পতিত হয়। স্খলিত হয়। দি সেভেন ডেডলি সিনস। সপ্ত জঘন্য পাপ। পবিত্র কুরআনও বলছেন ওয়া খুলিক্বল ইনন সা-নু দ্বয়ীফা। অর্থাৎ আদম সন্তান জয়ীফ। দুর্বল বিশেষ। কাজেই যুক্তিবুদ্ধির বাহিরেও অনেক প্রভাবক আছে। নিজের ক্ষেত্রে আমার উপলব্ধি হলো কোন মতকে প্রতিষ্ঠা বা খন্ডন করবার যে জজবা তার উৎস হলো অভ্যন্তরীন মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগতি বজায় রাখবার তাড়না। অর্থাৎ যে করেই হোক নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে এই তাড়না থেকে নয় বরং সুসংগতভাবে ভিন্নমতকে নিজের চিন্তাকাঠামোয় সংস্থাপিত করতে না পারবার অসহায়ত্ব থেকে। ঠিক এই বিষয়টাই আমেরিকান সিটকম দি বিগ ব্যাঙ্গ থিওরীর শেলডনের চরিত্রে  ফুটে উঠেছে। যদিও হাস্যরস উৎপাদনের নিমিত্তে তাতে অতিরঞ্জন রয়েছে বেশ। অন্যদের দৃষ্টিতে তুচ্ছ হলেও অনেক বিষয় শেলডনের মানস কাঠামোর সংগতি ধরে রাখবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংগতি নষ্ট হবার উপক্রম হলে কি বোধ হয় লেনার্ডের শরীরে চুলকানির ব্যবস্থা করে সে প্রমাণ করেছে। কিন্তু আমি সবেচেয়ে বেশী চমৎকৃত হয়েছি বছর খানেক আগে ব্রায়ান ম্যাগীর আত্মজীবনী কনফেশনস অফ এ ফিলসফার পড়ে। এই কিতাব-টি ঢাউস হলেও পড়া উচিত। এই কিতাবে উক্ত লেখকের সহজাত দার্শনিক মানসের অনেক গুলোর সাথেই যেমন আমি নিজের মিল খুঁজে পেয়েছি তেমনই অনেকগুলো ঠিক ততোটাই মনে হয়েছে পরকীয়-ফরেন। নিজের দার্শনিক প্রশ্ন সমূহের কৌতুহল মেটাবার ঐটাই ছিলো আমার শেষ প্রচেষ্টা। অন্তত: একাডেমিক দর্শনশাস্ত্রের ব্যাপারেআগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম ঐ কিতাব পাঠের পর। কিন্তু সব চেয়ে বেশী পুলকিত হয়েছিলাম কার্ল পপার সম্বন্ধে লেখকের মূল্যায়ণে। তাঁর সাথে বৈঠকের অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক বলছেন যে দি ওপেন সোসাইটি এন্ড ইটস এনিমি এর লেখক পপারকে কি রকম পরমত অসহিষ্ণু মনে হয়েছিলো তাঁর কাছে। পইড়া খুশীতে আমার দাঁত বেরিয়ে গিয়েছিলো। সর্বজনস্বীকৃত পন্ডিতদের চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের সাথে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া আমার মতো সেই সব ব্যক্তিবর্গের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপাদেয় যারা স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়ায় অভ্যস্ত নয়। লেখক যখন বলছিলেন যে বাৎচিতের সময় পপারের চিন্তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হলে কিভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি ফুঁসে উঠতেন। কি কথা হয়েছিলো তা তো তিনি আর বলেন নাই। আর বললেও তা বাছবিচার করবার মতো একাডেমিক দার্শনিক জ্ঞান আমার নাই। কিন্তু আমার তখন ঠিক এই উপলব্ধি হয়েছিলো যে পপার নিশ্চই তাঁর চিন্তার কাঠামোর প্রেক্ষাপটে ঐ প্রতিচিন্তার অসংগতি-অসারতায় অস্থির হয়েছিলেন। এইটা স্বয়ংক্রিয়-স্বত:স্ফূর্ত। পরমত অসহিষ্ণু বলে আমার মনে হয়নি। তবে পপারের প্রতি যে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার অভিযোগ অর্থাৎ স্বীকৃতি ব্যতিরেকেই অপরের চিন্তা করায়ত্ব করবার মানসিকতা-টা অত্যন্ত ঘৃণ্য বটে! কথা হলো ব্রায়ান ম্যাগী একজন স্বীকৃত দার্শনিক ছিলেন। বিংশ শতকে মহাকাশ বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে কার্ল সাগানকে যেমন সবচেয়ে বড়ো প্রভাবক হিসেবে গন্য করা হয় দর্শনের ক্ষেত্রে ব্রায়ান ম্যাগী ছিলেন তদ্রুপ। নিজেকে পপারের সমপর্যায়ের দাবী করবার উদ্দেশ্য নয় বরং দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ (intellectual discourse), গণআলাপ (public discourse) এর দৈন্যদশায় এই প্রশ্ন করাটা বাঞ্ছনীয় যে, ব্রায়ান ম্যাগীর আলাপেই যদি পপারের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয় তাহলে বানলার ওঁচাশ্রেনীটার অসংলগ্ন কথাবার্তা ও উৎকট কাজকারবার অবলোকনের পর স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার মানুষদের পক্ষে কি করে সুস্থির থাকা সম্ভব?

Popular posts from this blog

The Politics of Funeral

বামাতি রাজনীতি থেকে উৎসারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে প্রলপন