পাকিদের জন্য পাকিস্থান, নাপাকিদের জন্য নাপাকিস্থান
তুর্কী অভিবাসী সিরিয়ান অধ্যাপক আবদেল এর একটি পোস্টে খুব-ই আন্দোলিত হলাম। নিজ দেশের কথা, নিজ দেশের দুর্দশার কথা, কি করে স্বাধীনতার নামে ধর্মহীন-হীনজাত-লোভীদের খপ্পরে পড়ে এমন সুন্দর দেশটা ধ্বংস হয়ে গেলো - সেই কথা চিন্তা করে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম। অধ্যাপক সাহেব পোস্টে তুরস্কের একটি পরিচ্ছন্ন সাজানো গোছানো পরিপাটি এলাকার কয়েকটি ছবি দিয়ে বলছেন যে এটি তুরস্কের সীমিত আয়ের দরিদ্র এলাকাগুলোর একটি!
সাথে সাথে আমার দেশের অভিজাত এলাকা গুলোর কথা মনে পড়ে গেলো। যে এলাকাগুলো গড়ে উঠেছে রেশনের চাল খেয়ে নবাব হয়ে ওঠা লোকদের দ্বারা। সেগুলোও সাজানো-গোছানো-পরিপাটি। একটু বেশী-ই। সেখানেই প্রথম প্রজন্মের নবাব আর বংশপরম্পরায় মনুষ্যত্ব ও উৎকর্ষের চর্চা করা, সভ্যতা-সংস্কৃতির চর্চা করা, ধর্মপ্রাণ মানুষদের পার্থক্য।
ঢাকার যেকোন অভিজাত এলাকায় যান। দেখবেন পাশ্চাত্যের মতো কি সুন্দর সব দালান। সামনে বিদেশী ধাঁচেই গড়ে তোলা প্যাশিও-পোর্চ। অপর পাশের মার্কেটের দোতলায় চোখ ধাঁধাঁনো ইন্টেরিয়র করা ফাস্ট ফুডের দোকান। দোকানে বসে ধনীর দুলালীরা তাদের বয় ফ্রেন্ড নিয়ে আয়েশ করে কি খাচ্ছে তা দেখে যেনো রাস্তার ভিখারীরা হা-হুতাশ করতে পারে সেজন্য পরিষ্কার স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল রয়েছে। রাস্তার মাঝখানের ম্যানহোল দিয়ে ভকভক করে চেতনা বেরিয়ে আসছে। রেস্টুরেন্টের খাদক কিংবা পথচারী কারও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ আম্রিকান ফ্রাঞ্চাইজের ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে পেরে গর্বিত। কেউ সর্বাধুনিক মডেলের স্মার্ট ফোন দিয়ে সেলফি তুলছে। একেবারে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড গলাগলি। বয়ফ্রেন্ডের হাতে গোলাপ ফুল। গার্লফ্রেন্ডের মুখে হাসি। পেছনে ভকভক ম্যানহোল। সবাই খুশী। মুঝকো বানলাদেশ বানা দো।
জীবনে বোধহয় একবারই বিজ্ঞাপনের পাল্লায় পড়েছিলাম। ইতালীর ঐতিহাসিক কোম্পানী বেনেলীর টিএনটি (Tornado Naked Tre) সিরিজের মোটরবাইক। বাইক নিয়ে বিজ্ঞাপনের মডেল শীতে ঝরে পড়া রাস্তার পাতা উড়িয়ে দিগন্তে ছুটে চললো। তাকে দেখে আমিও বাইক নিয়ে দিলাম ছুট। রাস্তার নুড়ি-পাথর, গর্ত-খানা-খন্দক মাড়িয়ে টর্নেডোর গতিতে ছুটে চলেছি। রাস্তার পাশে জমিয়ে রাখা ময়লার স্তুপের পোকামাকড়-কীটবর্জ্য সব এসে একে একে হেলমেটের ভাইসরে আছড়ে পড়ে গলে যেতে লাগলো। রোমাঞ্চিত হবার প্রত্যাশা নিয়ে বেরিয়েছিলাম। শিহরিত হয়ে গেলাম। গা রিরি করতে লাগলো। চকিতে তাকাতেই দেখি ভাগাড়ের শুয়োর গুলো সোৎসাহে ভোজনে নেমে পড়েছে। এতো বড়ো শুয়োর আমি জীবনে আর কখনও দেখি নাই। টকশোতেও না।
অথচ এ দেশের অধিকাংশ মানুষ-ই নাকি মোছলমান। এরা নিজেদের সেই ধর্মের অনুসারী বলে দাবী করে যে ধর্মের নিকট পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ বলে বিবেচিত। বাঙ্গালী মুসলমানের ব্যাপারে আইয়্যুবের মূল্যায়ন মনে পড়ে যায়:
a large majority of the Muslims in East Pakistan have an animist base which is a thick layer of Hinduism and top crust of Islam which is pierced by Hinduism from time to time
অর্থাৎ,
পূর্ব-পাকিস্তানের মুসলমানেরা মূলত সর্বপ্রাণবাদী যা হিন্দুত্ববাদেরই প্রভাব। এর ওপরে রয়েছে একটি পাতলা ইসলামী লেবাস যা প্রায়শ হিন্দুত্ববাদের ছোবলে ছিন্ন-ভিন্ন হয়।
কিংবা:
I am surprised at the Bengali outlook. It does not conform to any rational yardstick. They were exploited by the caste Hindus, the Mughal rulers and even the British. It was at the advent of Pakistan that they got the blessing of freedom and equality of status and a real voice in the running of their government. . . any normal people should have recognized and rejoiced at this blessing. Instead, they urge to fall back on their Bengali past. This can only result in their complete absorption by Hindu West Bengal influenceঅর্থাৎ,
বাঙ্গালী মানস আমাকে হতবাক করে। কেননা যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে একে হৃদয়ঙ্গম করা কঠিন। হিন্দু জাতপ্রথা, মোঘল শাসক ও ব্রিটিশদের দ্বারা তারা শোষিত ছিলো। পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের পরই তারা স্বাধীনতা এবং শাসনকার্যে সমমর্যাদা পেয়েছিলো। যেকোন স্বাভাবিক জাতিগোষ্ঠী একে সাধুবাদ জানানোর কথা। কিন্তু বাঙ্গালীরা তাদের অতীতেই ফিরে যেতে উন্মুখ। ফলত: পশ্চিম বাঙ্গলার হিন্দুদের প্রভাবে লীন হওয়াই তাদের একমাত্র পরিণতি।হিন্দু ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান গুলো যদি দেখেন এবং মোটা দাগে প্রকৃতিপূজারী কিংবা প্যাগানিজম-প্যানথিইজম কিংবা শয়তান পূজারীদের যদি দেখেন দেখবেন তাদের আচার-অনুষ্ঠান গুলো অত্যন্ত কদর্য ও নোংরা। ইসলাম ধর্মের মতো তাহারাত বা Ritual Purification বা আচারনিষ্ঠ শুদ্ধতার ধারণা তাদের প্রায় সকলের মধ্যে অনুপস্থিত। দিওয়ালীর নামে যা চলে তা মূলত পরিবেশ দূষণ-ই। হিন্দুদের গোবর উৎসব এর কথা নাহয় বাদ-ই থাক। কলেরার ভয়ে এরুপের যে জঙ্গলীগুলো গুশু দিতো না তারা মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে সুগন্ধি ব্যবহার করা শিখলেও পবিত্রতা অর্জন করা শিখতে পারেনি।
তবে বানলারা মুসলমান হলেও পরিচ্ছনতা শিখতে পারেনি একথা মনে হয় অসত্য। বরং এটাই অধিকতর সত্য মনে হয় যে বাঙ্গালী মুসলমানের অধ:পতনের কারিগর কলোনিয়াল আমল। কেননা সুলতানী আমলে অত্রাঞ্চলের উন্নতি-শৌর্য-বীর্য, সাজানো-গোছানো রাস্তা ঘাটের কথা বিদেশী পর্যটকদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। আর যাবেই বা না কেনো? যে ইসলাম খোদার যমীনকে মসজিদ বলে গন্য করে তার অনুসারীদের পক্ষে সেই যমীন-কে অপবিত্র করে রাখা সাজে? যে ইসলাম তার অনুসারীদের পাঁচ ওয়াক্ত ওযু করতে বাধ্য করে তার পক্ষে জলাধার দূষিত করা সম্ভব?
এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব যাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বালাই নাই। আর এ কারনেই বামাতি-ধর্মবিরুদ্ধ পান্ডারা যখন যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর জেঁকে বসতে পেরেছিলো সে অঞ্চল-ই তাদের অবহেলায় আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছিলো। অধ্যাপক সাহেবের পোস্টের বিপরীতে জমা মন্তব্যগুলোর একটিতে দেখলাম একজন লিখেছে যে এরদোগানের আক পার্টি ক্ষমতায় আসবার আগে যার তুরস্কের আলিগলিতে ভ্রমণ করেছিলো তারা বিশ বছর পর যদি এখন ভ্রমণ করে তাহলে পরিচ্ছন্নতার পার্থক্য-টি তাদের চোখে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।
অত্র পোস্টে লোকজন এও বলাবলি করছে যে এমনকি আরবদের থেকেও তুরস্কের শহর গুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বেশী। একজন বলেছেন তুর্কীদের পর্যায়ে পৌঁছতে আরবদের আরও কয়েকশ বছর লাগবে। কারণ যতোক্ষণ পর্যন্ত না মানুষ নিজের দেশকে আপন করে নিতে পারছে ততোক্ষণ পর্যন্ত দেশের রাস্তাঘাট সমূহকে নিজের ঘরের মতো পরিচ্ছন্ন রাখবার দায় তার মধ্যে তৈরী হয় না। আওমীলীগ সহ বিগত '৫৬ বৎসরের শাসককুল যে বাংলাদেশকে আপন করে নিতে পারেনাই তা দেশকে ভাগাড়ে পরিণত করা, দেশ থেকে ভেগে যাওয়া, বিদেশে বেগম পাড়া বানানো, কিংবা দেশকে দেউলিয়া করে অর্থপাচারের বন্দোবস্ত করা থেকেই পরিষ্কার।
ধর্মহীন-হীনজাত এসব শাসককুল বাদ দিলেও দেশের সাধারণ জনগণেরও বদ খাসলতের কমতি নেই। বস্তি থেকে রাতারাতি এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এ উঠে আসা ফকিন্নীদের কাজকারবারই বলে দেয় কেনো এই দেশের এই অবস্থা। সবর্দা দেশপ্রেমের ধোঁয়া তোলা বানলাটি বিদেশী চিপস খেয়ে অবলীলায় তার খোসাটি জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে। ঢাকা শহরের উঁচু দালানগুলোর গ্যারেজের ছাদ লক্ষ্য করলে দেখবেন সেখানে পলিথিন, টিস্যু পেপার থেকে শুরু করে একেবারে মাসিকের ত্যানা পর্যন্ত পড়ে আছে। প্রায় প্রত্যেকটা বিল্ডিং কারনে-অকারনে মুতে। পানি পড়ে ভেসে যায়। কারন বানাগালী দরে রাকতে পারে না, সেরে দেয়।
একটা সময় ছিলো যাত্রা পথের পুরোটা সময় কোন ডাস্টবিন না পেয়ে হাতের ফেলনা পকেটে পুরে বাসায় চলে এসেছি। এখন মনে হচ্ছে এই বস্তিপট্টিতে থাকতে হলে এদের মতো করেই থাকতে হবে। বানগালী হতে হবে। পারবো কিনা জানিনা। সম্ভাবনা কম।
একদা এক ট্যুর গাইড ভ্রমণস্থান (tourist spot) পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে জোশের সাথে একটা বক্তৃতা দিলেন। আমরা যত্রতত্র ময়লা না ফেলি। খুব ফযীলত হবে! তো এক বিকেলে খাওয়ার সময় দেখি ঐ বেচারা হাতের টিস্যু ফেলবার জায়গা না পেয়ে অতি সন্তর্পণে এদিক ওদিকে চোরা দৃষ্টি দিয়ে লোক চক্ষুর আড়ালে মেঝেতেই টিস্যু-টি ফেলে দিলো। কিন্তু আমিতো তাকে দেখে ফেলেছি! মুজতবা আলীর ভাষায়, তার জর্মন মুখোশ ততোক্ষণে খসে পড়েছে। সে এখন তাল তলার নেটিব, কালা আদমী ইত্যাদি ইত্যাদি।
আসল কথা হলো এদেশের সমস্যা গুলোর কারন বহুবিধ। সেই নিয়ে আরেকদিন হয়তো বলবো। কারন এর ব্যবচ্ছেদ করা অতীব জরুরী। আজ শুধু এতোটুকু বলাই যথেষ্ট যে বাংলাদেশের এই বর্তমান অপরিচ্ছন্নতার জন্য শুধু যে দারিদ্র কিংবা ব্যবস্থাপনার অভাব ও অদক্ষতাই দায়ী তা-ই নয়। বরং এর পেছনে মানুষের ধর্ম বিশ্বাস, জীবন দর্শনগত একটা প্রভাবও বিদ্যমান। এখন বাংলাদেশের মানুষকেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিগত বৎসরগুলোতে গড়ে তোলা এই নাপাকিস্থানেই থাকতে চায় নাকি প্রকৃত মুসলমানের মতো তাহারাতে উজ্জীবিত হয়ে নিজের মন-মনন, পোশাক-আশাক, ঘরদুয়ার, রাস্তাঘাটেও তার প্রতিফলন ঘটিয়ে দেশকে পূতপবিত্র করতে চায় অর্থাৎ পাকিস্তানের বিনির্মাণ করতে চায়। সিদ্ধান্ত তাদের।