বাংলাদেশের ভবিষ্যত, ইসলামপন্থার ভবিষ্যত: প্রেক্ষাপট '২৬ এর এলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং

অনেকেই জিজ্ঞেস করেন ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠা পরবর্তী জামায়াতে ইসলামীর অর্জন কি? আমার মনে হয় '২৬ এর নির্বাচনের পূর্বাপর পরিস্থিতির বিশ্লেষণে এর একটা জুতসই উত্তর বিদ্যমান। এই নির্বাচনে আমরা দেখেছি বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ কিভাবে জামাতের প্রতি তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করেছে। আজ থেকে দশ বছর আগেও ক'জন ভাবতো যে মিডিয়ার রঙ্গিণ জগতের নায়িকারা প্রকাশ্যে জামাতকে সমর্থন করবে? দেশ-বিদেশে সেকুলার জীবনে অভ্যস্ত স্বল্প-বসনা নারীরা জামাতের সংগ্রামের সাথে অকুন্ঠ চিত্তে সমর্থন জ্ঞাপন করবে? অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসাররা প্রকাশ্যে জামাতের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাবে? বাম ঘরানার রথী-মহারথীরা জামাতের বিজয়ের জন্য প্রাণাতিপাত করবে? বিএনপির মতো এতো বড়ো দলের প্রবীণ নেতাদেরও জামাত তো বটেই এমনকি জুলাই'২৪ এর নাবালক নেতাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্যও কারচুপির আশ্রয় নিতে হবে? ইতিপূর্বে বাংলাদেশে ইসলাম ও শরীয়তের আলাপ আর কোন নির্বাচনে এতো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পেরেছিলো?

কি মনে হয়? এসব একদিনে এমনিতেই হয়ে গেছে? না। এটাই ঐ '৪১ সাল থেকে শুরু করে ৮৪ বৎসরের সংগ্রামের ফসল। এবং আমার মনে হচ্ছে এই নির্বাচন বলে দিচ্ছে যে এই সংগ্রামে বিজয়ের পথের বড়ো অংশটা আমরা মাড়িয়ে এসেছি। ইনশাল্লাহ।

সন্দেহ নেই যারা জামাতের পক্ষে খেয়ে না খেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করেছেন তারা খুবই আশাহত। এটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশ বিরোধী, জনবিরোধী শক্তিটি এলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিন করে "সফল" হয়ে গেছে এটা বোধ হয় সঠিক নয়। বরং তাদের এলেকশন এনজিনিয়রিং এর এই যে পরিবর্তন অর্থাৎ আগে ভোট চুরি-ডাকাত করতো, দিনের ভোট রাতে দিতো, আমি-ডামি এলেকশন করতো এবার তারা বাধ্য হচ্ছে অধিকতর সূক্ষ পন্থা অবলম্বনের। এই যে পরিবর্তন এটাই আপনাদের সফলতা। যদি আপনারা জামাতের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকেন এবং এই সংগ্রাম জারি রাখেন তাহলে এই জীবনেই বিজয়ের দেখা পাবেন বলে মনে হয়।

অন্তত নির্বাচনী ফলাফলে তাই মনে হচ্ছে। বিএনপি জোটের পক্ষ থেকে গ্রামাঞ্চলের নির্বাচনী সন্ত্রাস করেও শেষ মূহুর্তে ফল গণনায় কারসাজির আশ্রয় নেয়া সহ সমস্ত অপচেষ্টা স্বত্বেও প্রায় অর্ধ শতাধিক আসনে জামাত জোট মাত্র একশ ভোট থেকে পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যাওয়াটা আসলে আপনাদের বিরাট বিজয়। বিজয় এ কারনেই যে আপনারা সহিংসতায় না জড়িয়েও যা অর্জন করতে পেরেছেন জনদ্রোহী, দেশদ্রোহী পক্ষটি সহিংস কার্যক্রম চালানো স্বত্তেও তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়ে শেষমেষ গণনার কেরামতি করতে বাধ্য হয়েছে।

এই এলেকশন দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছে যে জিয়া পরিবারের যেই ভদ্রজনোচিত, সুশীল উপস্থাপন আমরা জনপরিসরে দেখি তার পুরোটাই লোক দেখানো, মেকী। সুশীলতার মুখোশ খুলে নিজের কপট ও লোভাতুর চরিত্রকে জনসম্মুখে উন্মোচন করবার জন্য তারেক রহমান অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এই যে ওনার বাংলাদেশপন্থার খোল-নলচে বেরিয়ে পড়লো এটাই এই নির্বাচনে জনগণের অন্যতম অর্জন। আওমীদের কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপনোদনের পর এবার "প্রয়াত" জিয়ার বিএনপির দ্বারা তার বাদবাকী কংকাল সারের কবর রচনা হবার অপেক্ষায়।

যদি আমরা দ্ব্যর্থহীন চিত্তে জামাত জোটকে ভোট না দিতেন তাহলে তা সম্ভব হতো না। যারা জামাতে ইসলামীর প্রতি চিরকাল ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করবার অভিযোগ করে এসেছিলো নির্বাচনের সময়ে তাদের মাথায় হাসিনার মতো পট্টি আমরা দেখতাম না। শুনতে হতো না লন্ডন ফেরত সেকুলার মুফতির দায়েশী কায়দার তকফিরী কিংবা ভোট রাজনীতিতে চিরকাল ফেল মারা বামাতিদের ইস্যুকৃত ফতোয়া-এ-মলমগিরি।

এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো নারায়নি হুজুর ও আকীদার আকাবীরদের শোচনীয় পরাজয়। এতে যেমন আছেন, আমাদের সবার প্রিয়, ১৪৩ টা আসনের এ-গ্রেড ফদাংমোনতি।  মানে পীর সাপ চর্ম নাই, লেবাস আছে ধর্ম নাই। তেমনি আছেন, ক্ষতি-এ-বানগাল ওরফে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দু। আরও আছেন মানহাজী গং এর হাফি: বৃন্দ। এদের প্রত্যেকে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন চূড়ান্তভাবে। আল-হামদুলিল্লাহ। ওয়া আশ-শুকরিল্লাহ।

এই নির্বাচন প্রমাণ করে দিলো যে ইসলাপন্থীদের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়াটা কতোটাই যুগোপযোগী ও বাঞ্চনীয়। লক্ষ্য করুন এই যে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষ জামাতের মতো একটি ইসলামপন্থী দলকে ভোট দিলো, এর পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করলো, ঠিক এই সংখ্যক লোককে যদি আপনি মানহাজী স্টাইলে "দাওয়াহ" দিয়ে দলে ভেড়াতেন তাহলে তার ফল কি হতো? আপনি "বিপ্লব" করে ফেলতেন? না। বরং এই যে এতো বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে আপনি দাওয়াত, তরবিয়্যত ও রাজনীতি দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে আসলেন তারও কোন বৈধতা আপনি উৎপাদন করতে ব্যর্থ হতেন।

অনেককেই দেখলাম সশস্ত্র বাহিনী ও তথাকথিত ডিপস্টেট এর আলাপ তুলেছেন। শোনেন ভাই, আপনারা এক থাকেন। সংগ্রাম জারী রাখেন। সেনাবাহিনী-ডিপস্টেট কোন বিষয়ই নয়। যে বাহিনী আওমী আমলে নিজে হোগামারা খেয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করতে পারেনি তারা এবার অন্তত সাহস করে দিনের বেলায় মোটা দাগে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট প্রদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে এইটাই বা কম কি? আমাদের মাওলানা রহ: সাহেব বলেছিলেন যে,

এই গুলি হইলো লাঠি। যার হাতে যায়, তার কথা কয়।

আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকেন। সংগ্রাম জারী রাখেন। ক্ষমতা আপনাদের পায়ে এসে পড়বে। এসব বাহিনী, ডিপস্টেটও তখন আপনাদের কথা বলবে।

তবে সর্বপোরি বিগত ৮৪ বছরে জামাতের সবচেয়ে বড়ো যেই অর্জন তা হলো এই যে তারা একটি সুবিশাল ইসলামপন্থী নেতৃত্ব তৈরী করতে পেরেছে। যারা পোড় খাওয়া। মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে জানে। এটাই জামাতের সবচেয়ে বড়ো অর্জন। এটাই জামাতের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার। তরুনদের বলি এরকম হাতিয়ার হওয়ার চেষ্টা করো। আল্লায় দিলে কেউ তোমাদের হারাইয়ে পারবেনা। ইনশাল্লাহ। নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারিব।


সবশেষে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ, সর্বস্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের সেলুট 🫡। You all have done a terrific job 🔥! Keep going. 👍

Popular posts from this blog

বামাতি রাজনীতি থেকে উৎসারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ

The Politics of Funeral

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে প্রলপন