বিগত তিরিশ বছরের ইসলামী স্বাধীকার আন্দোলনের শিক্ষা

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে আলজেরিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয় ইসলামপন্থীরা সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে। দেশের বামাতি ও সেনাপট্টির মণিকাঞ্চন যোগে সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। আলজেরিয়া পড়ে যায় গৃহযুদ্ধের করাল গ্রাসে। আলজেরিয়ার এই ঘটনা সারা বিশ্বে ইসলামের পুনর্জাগরণবাদীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম জনসাধারণের পক্ষ থেকে ইসলামী শাসনের প্রতি বৈধতা উৎপদান করা স্বত্তেও তাগুতি শক্তির পক্ষ থেকে নৃশংসভাবে গণহত্যা সংঘটের মাধ্যমে তার উত্থান ঠেকানোর প্রচেষ্টায় ইসলামপ্রিয় জনতা স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

ইতিপূর্বে মুসলিম দেশ সমূহে ঔপনিবেশিক আমলের সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল ঘরে তুলতে না পারায় ধীরে ধীরে মুসলিমদের মধ্যে ঔপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের ধর্মীয় স্বাধিকার ও স্বায়ত্বশাসনের তথা ইসলামী পুনর্জাগরণের সংগ্রাম জারি রাখবার একটা প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে সুলতান আব্দুল হামিদ রহ: সহ জর্মন ও আফগান পৃষ্ঠপোষকতা স্বত্তেও উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী "রেশমী রুমাল" আন্দোলন যখন সফল হলো না তখন সশস্ত্র সংগ্রাম ছেড়ে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের দিকে একটা নুতন জোয়ার তৈরী হয় "স্যার" সৈয়দ আহমেদ খানের নেতৃত্বে আলীগড় আন্দোলনের মাধ্যমে। উপমহাদেশে "জামায়াতে ইসলামী" ও মধ্যপ্রাচ্যের "মুসলিম ভাতৃসংঘ" -কে ঐ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখবার যথেষ্ট সুযোগ আছে।

আলজেরিয়ার ঘটনায় ইসলামপন্থীদের মধ্যে রাষ্ট্র্যযন্ত্রে ইসলাম বিদ্বেষী বিশেষত বামাতি কিংবা তাগুতি অনুঘটক ও কুশীলবদের প্রতি সচেতনতা তৈরী হয়। সেই সূত্রেই তাদের এই রাজনৈতিক তরবিয়্যতের কার্যক্রম। অর্থাৎ অদ্ভুত শোনালেও মুসলিম পরিবারের সন্তানদের মধ্য থেকে ইসলামী শাসনের প্রতি বিদ্বেষ ও সংশয় দূর করবার প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টাও সব দেশে একই ভাবে দৃশ্যমান হয় নাই। মিশরের রাষ্ট্র্যযন্ত্রে এমনকি সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যেও ভাতৃসংঘের প্রতি সহানুভূতিশীল একটা উল্লেখযোগ্য অংশের উপস্থিতি স্বত্বেও আঞ্চলিক ও বিশ্ব রাজনীতির হিসাব-নিকাষের গ্যাড়াকলে পড়ে তা বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। বিপরীত পক্ষে তুরস্কে আমরা দেখেছি এরবাকানের আমলের পুলিশ ও প্রশাসনযন্ত্রে নিয়োগ ও সংস্কার কার্যক্রমের সুফল এরদোগানের আমলে পাওয়া গিয়েছিলো।

বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীও গ্রাম-গঞ্জের অবহেলিত তথাপি মেধাবী জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে নাম মাত্র মূল্যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দেবার কর্মসূচী নিয়েছিলো সেই একই প্রত্যাশায় যেনো একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতি দেশীয় প্রশাসন অন্তর্ঘাতমূলক হয়ে না ওঠে। তথাপি জামায়াত-শিবিরের খেয়ে-পড়ে বিগত মাফিয়া আমলে তাদের ওপর সবচেয়ে বেশী চড়াও হবার, তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবার একটা কথা প্রচলন আছে। যার সত্যাসত্য নির্ধারণ করা আমার পক্ষে সম্ভব না হলেও আমার নিকট তা বিশ্বাসযোগ্য। বিগত মাফিয়া বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সেনানী মাহমুদুর রহমান সাহেবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির কথা এই সূত্রে আবারও স্মরণ করিয়ে দিলে বুঝতে সহজ হবে। আর তা হলো খুব সম্ভবত কেবল বাঙ্গালীর অভিধানেই কৃতঘ্ন শব্দটি বিদ্যমান।

এক্ষেত্রে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো সংস্কার কার্যক্রম আর অনুপ্রবেশ কার্যক্রম (infiltration) এক নয়। এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো যে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয় প্রকাশ্যে, জনপরিসরে। অনুপ্রবেশ কার্যক্রম পরিচালিত হয় গোপনে, সুনির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি-গোষ্ঠীর মাধ্যমে। মিশরে দীর্ঘদিন যাবৎ সরকারের দ্বারা নিপীড়নের শিকার হবার পরও ভাতৃসংঘের এই ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে এই সংস্কার বা তরবিয়্যতের কার্যক্রম। কেননা সামরিক-পুঁজিতন্ত্রের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো উদরপূর্তি। আর ইখওয়ানের মূল উপজীব্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। সুতরাং দেখা গেলো শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জনসেবামূলক পরিসরে মিলিটারী পরিচালিত উচ্চ সেবামূল্যের প্রতিষ্ঠান গুলো ভাতৃসংঘ পরিচালিত প্রতিষ্ঠান সমূহের সাথে কিছুতেই পেরে উঠতে পারছিলোনা। কেননা ভাতৃসংঘের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছিলো নামমাত্র মূল্যে (break-even point)।

তবে ক্ষমতার লড়াই এতোটাই জটিল ও দুরুহ যে তার সরলীকরণের প্রচেষ্টা স্রেফ মূর্খতা। সেই সূত্রে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পক্ষশক্তি সমূহের দ্বারা "অনুপ্রবেশ কার্যক্রম"-এর বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো তার ন্যায্য-তা নির্ধারণ হবে কি দিয়ে? উত্তরটা জটিল নয়। সহজই। কেননা তার ন্যায্যতা নির্ধারিত হবে জনভিত্তির প্রশ্নে। জনস্বার্থের প্রশ্নে। একেবারে সেই ক্রমানুসারে। অর্থাৎ জনভিত্তি না থাকলে জনস্বার্থের আলাপ তোলার সুযোগ নাই। গণতন্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা ও উপযোগীতা এখানেই। কেননা তার অনুপস্থিতিতে জনস্বার্থ নির্ধারণের বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় জটিল, আপেক্ষিক। আর ঠিক এই সুযোগ-টাই নেয় বিজাতীয় কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সমূহ।

এর একটা উদাহরণ আমরা দেখি বাদশাহ শাহজাহানের স্বাস্থ্যের অবনতি উত্তর মোঘল সাম্রাজ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে। যে সকল অমাত্যবর্গ ও বাহিনী প্রধানগণ শাহজাদাদের নানা পক্ষে বিভক্ত হয়েছিলেন তাদের কাউকেই বাতিলের খাতায় ফেলবার তেমন সুযোগ নেই। কেননা তাঁরা রাষ্ট্র্যর-ই অংশ। যদ্যপি বিজাতীয় শক্তি সমূহের সাথে তাদের আঁতাতের মাধ্যমে "জনস্বার্থ" বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আবারও কিন্তু সেই "জনস্বার্থ"-এর ঘোটালে প্রসঙ্গ চলে আসলো। গণতন্ত্র সেই সূত্রে একটা বেটার দেন নাথিং পদ্ধতি। যাইহোক, বিদেশী শক্তির সহায়তা নেয়াও যে সব সময় জাতীয় স্বার্থ বিরোধী নয় এর দ্বারা তা-ই স্পষ্ট হলো। কেননা অনেক সময় জাতি তার নিজস্ব স্বার্থেই বিভিন্ন বিজাতীয়দের সাথে মিত্রতা করে চলে তাদের উপস্থিত শত্রুপক্ষের বিপরীতে টিক থাকবার প্রয়োজনে।

তুরস্কে গুলেন চক্রের ঘটনা এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। এই চক্র-টি তার প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই অস্পষ্ট কার্যক্রম দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। তাদের কার্যকলাপ প্রধানত অরাজনৈতিক হলেও তাদের রাজনৈতিক অভিলাষের বিষয়টি বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বারংবার আলোচিত হয়েছে। সর্বশেষ যা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিলো গণবিরোধী জুলাই'১৫ সেনাঅভ্যুত্থানের সময়। এরবাকানের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত ও সংস্কার হওয়া পুলিশ বাহিনী-ই সেই সেনাঅভ্য়ুত্থানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইটা করেছিলো যার প্রমাণ মেলে সেনা বিদ্রোহীদের কর্তৃক পুলিশ হেড কোয়ার্টার গুঁড়িয়ে দেয়ায়। সেই সাথে সামরিক বাহিনীর ফার্স্ট আর্মি কমান্ডার জেনারেল উমিত দুন্দারের প্রত্যুৎপন্নমতিতা ও অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অবস্থানের সাহসি ঘোষণা সেই সেনাঅভ্যুত্থান নস্যাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। অথচ মিনিট দুয়েক এদিক-সেদিক হলে এরদোগানের আততায়ীরা সফল হয়ে যেতো।

একটি দেশের বিমান বাহিনীর একাংশ এফ সিক্সটিন যুদ্ধবিমান দিয়ে নিজ দেশের সংসদ ভবনের ওপর হামলা চালিয়েছে। সামরিক বাহিনীর আরেকাংশ সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্র্যপ্রধানকে হত্যার উদ্দেশ্যে কমান্ডো পাঠিয়েছে। তারপরও আমরা দেখেছি তথাকথিত গণতন্ত্রবাদী পাশ্চাত্যদেশ সমূহের পক্ষ থেকে এর প্রতি নিন্দা জানানোর ব্যাপারে এক অবিশ্বাস্য জড়তা! অর্থাৎ সে-ই আলজেরীয়ার ঘটনার পুরাবৃত্তির প্রচেষ্টা।

ঠিক এই জিনিস-ই আমরা দেখেছিলাম ২০০৭ সালে গাযযায় সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে হামাসের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরও তথাকথিত গণতন্ত্রবাদী পাশ্চাত্যদেশ সমূহের পক্ষ থেকে তার বৈধতা প্রদানের অস্বীকৃতিতে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিলো মিশরেও। একটি ঐতিহাসিক সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম ভাতৃসংঘের ক্ষমতায় আসীন হবার পরও মিলিটারী-বামাতি-পশ্চিমা সহ সকল তাগুতি শক্তির ঐক্যবদ্ধ ষঢ়যন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামপ্রিয় জনতার নৃশংস অবদমন। অর্থাৎ বামাতি ও পশ্চিমারা একটা একটার সাথে প্রতিনিয়ত কামড়াকামড়ি করলেও খোদাদ্রোহীতায়, জনদ্রোহীতায়, ও শোষণের বন্দোবস্তে এরা একাট্টা।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটে, ঠিক এই পর্যায়ে এসেই উম্মাহর একাংশের মধ্যে আবারও সেই সশস্ত্র পন্থায় জিহাদে অবতীর্ণ হবার সচেতনতার (awareness) পুনরাবির্ভাব ঘটছে। ঠিক এই সূত্রেই আল-কায়েদা সহ আফগানিস্তান ও সিরিয়ার সশস্ত্র সংগ্রাম প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করেছে। অর্থাৎ আমরা সশস্ত্র কিংবা রাজনৈতিক সংগ্রামের আরেকটি চক্রের মধ্যে পড়ে গিয়েছি। এবং তা এই কারনেই যে আমাদের প্রতিপক্ষ-কে মহান আল্লাহ সাময়িক সময়ের জন্য অধিকতর শক্তিশালী করবার মধ্য দিয়ে মুসলিম উম্মাহকে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত করে তুলছেন।

আমার স্বল্প পড়ালেখায় এবং সীমিত ভেদবুদ্ধিতে মনে হয়েছে যে সশস্ত্রপন্থীদের মধ্যে বিশেষ করে করে আল-কায়েদার সবচাইতে বড়ো বিভ্রম (blunder) ছিলো তাদের যুদ্ধকে সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে বেসামরিক পরিসরে ছড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টায়। এটা যে মোটাদাগে শরীয়ত সম্মত নয় তা সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও স্রেফ সামরিক বিচারে এর কার্যকরিতা নিয়ে আছে নানা আলাপ। বিশেষত পশ্চিমের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের লেখায় এটা স্পষ্ট যে আল-লিবির (যদি আমি সঠিকভাবে স্মরণ করে থাকতে পারি) প্রস্তাবিত "লৌন উলফ" পদ্ধতিতে আক্রমণের কৌশল পশ্চিমা সিকিউরিটি এপারেটাসকে বেশ ভালো ভাবেই নাকানি-চুবানি খাওয়াতে পেরেছে।

কিন্তু সেই লাইনে আলাপ হয়েছে মেলা এবং তা প্রধানত কুফরী মানসের ভিত্তিতে। আমি ব্যাপারটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চাই। আর তাহলো আমার মতে পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রানুযায়ী বস্তু সমূহের মধ্যে যে নানাবিধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও টানাপোড়েনের সূত্রাবলী বিদ্যমান তদ্রুপ সমাজের গতিপ্রকৃতিরও রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু বিধানাবলী। আমার মতে এহেন একটি সূত্রই আল-কোরআন বারংবার আদম সন্তানদের স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছে। আর তা হলো জুলুমবাদী, শোষণবাদী, খোদাদ্রোহীতায় লিপ্ত থাকার পরিণতি ভালো নয়। এইটা ব্যাকফায়ার করবেই। আপনি উপনিবেশবাদ-আধিপত্যবাদ কায়েম করবেন, ব্যবসার নামে শোষণ করবেন কিংবা অনন্ত বিপ্লবের (continuous revolution) নামে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখবেন এর পরিণতি-ই বর্তমান বিশ্বের এহেন নৈরাজ্য। অথচ এমন নয় যে পূর্বে পৃথিবীতে বেহেশত খানা কায়েম ছিলো। বরং বর্তমানের দজ্জালী বিশ্বের বৈশিষ্ট্য হলো নৈরাজ্যের বিশ্বায়ন। এখন আর সুনির্দিষ্ট কোন যুদ্ধক্ষেত্র নাই। তথাকথিত জাতিরাষ্ট্র্যের সীমানা থাকলেও তার কার্যকরীতা প্রশ্নবিদ্ধ। যাহোক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

আমার উপলব্ধি হলো, ইসলামী পুনর্জাগরণ কিংবা মুসলিম জাতিরাষ্ট্র্য সমূহে ইসলামের স্বায়ত্বশাসন যাকে আমরা সুশাসন ও উন্নয়নের পথে প্রথম শর্ত হিসেবে গণ্য করি তার বাস্তবায়নে সশস্ত্র বাহিনী সমূহের ভূমিকার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত। এর এক রুপ আমরা দেখেছি তুরস্কে। এর আরেক রুপ আমরা দেখেছি সিরিয়াতে। তৃতীয় আরেক রুপ পাকিস্তানে। আমাদের নিকট তুরস্কের সেনাবাহিনীর রূপান্তরের (transition) ঘটনার পুনরাবৃত্তি-ই অধিকতর কাম্য। কেননা তা প্রধানত রক্তপাতহীন, শান্তিপূর্ণ। তবে তা আদপে কতোটুকু অন্যত্র পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব সে-ও প্রশ্ন। তুরস্ক কখনোই সরাসরি উপনিবেশবাদের খপ্পরে পড়ে নাই। উসমানীয় সালতানাতের শেষ দিকে স্বকতীয়তা ও সঞ্জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলা যে জাতি, তার রাষ্ট্র্যযন্ত্র ও তার সশস্ত্র বাহিনী বিজাতীয় রসম-রেওয়াজ ও অপবিশ্বাসে ক্ষণিকের তরে পথহারা হয়েছিলো মহামতি এরদোগানের দুই যুগের কৌশলী নেতৃত্বে তার পক্ষে পুনরায় স্বকীয় শক্তিতে বলীয়ান হওয়া দু:সাধ্য হলেও অসাধ্য ছিলোনা।

ঠিক এ কারনেই সিরিয়ায় নানামুখী প্রচেষ্টা স্বত্তেও আমরা তার সফল পুনরাবৃত্তি দেখি নাই। একেতো উপনিবেশবাদী শাসনের জেরবার তার ওপর উপনিবেশোত্তর সংখ্যালঘু বামাতি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ সেকুলার শাসক শ্রেণীর দীর্ঘকালীন শোষণ-পীড়ন। এই দুইয়ের ধকলে গৃহযুদ্ধ-ই ছিলো একমাত্র অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। পাকিস্তানের বিষয়টি এক্ষেত্রে অনন্য। তাদের শত্রুজ্ঞানে জাতীয় ঐক্য সুপ্রতিষ্ঠিত। তাদের সেনাবাহিনী দেশের জন্য অন্ত:প্রাণ। উপরন্তু প্রবলভাবে ধর্মানুরাগী। তথাপি ধর্মীয় উপদল ও নৃতত্ত্বগত নানা সূত্রে তারা বিভাজিত। সুদীর্ঘ বিলাতী ঔনিবেশিক শাসন যাকে শুধু প্রকট-ই করে তোলে নাই বরং তার একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দান করেছে। বিশেষত দেশটির সেনাবাহিনীর এস্টাবলিশমেন্ট তাদের বাহিনীর সদস্যদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক স্বার্থের সাথে জাতীয় স্বার্থের একটা কিম্ভূতকিমাকার যোগসাজশ তৈরী করেছে। যার পরিণতি একেবারে ধ্বংসাত্মক না হলেও তা তাদের জাতীয় সম্ভাবনাকে (national potential)  করছে বাধাগ্রস্ত।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে মাওলানা মওদূদীর সেই চমৎকার বর্ণনা-ই আমার মানসপটে ইদানীং ভেসে ওঠে। যেখানে তিনি বর্ণনা করছেন যে ইসলামী আন্দোলন একটি প্রবহমান খোরস্রোতা নদীর মতো। যার সামনে বাঁধ দেয়া হলে সে অন্যত্র পথ করে নেয়। মহাসড়কে ব্যরিকেড দেয়া হলে গলি-ঘুঁপচিতে পরিব্রাজন করে। আর তার চতুর্দিকে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও সে ক্রমাণ্বয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠতে উঠতে একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ যেনো মুসলিম জাতি সমূহের পুনরুত্থান দান করেন। খেলাফতে রাশেদার পুনরুত্থান দান করেন। আমরা সে-ই দিনের প্রত্যাশায়। 

ফা সুবহা-নাল্লহি হীনা তুমসূনা ওয়া হীনা তুসবিহূন।
ওয়ালাহুল হামদু ফিসসামা- ওয়া-তি ওয়াল আরদি ওয়া 'আশিয়্যাঁও ওয়াহীনা তুদহিরূন।
য়ুখরিজুল হাইয়া মিনাল মাইয়্যিতি ওয়ায়ুখরিজুল মাইয়্যিতা মিনাল হাইয়্যি ওয়া য়ুহয়িল আরদা বা'আদা মাওতি হা-
ওয়া কাযা-লিকা তুখ র জূন।। 

Popular posts from this blog

বামাতি রাজনীতি থেকে উৎসারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ

The Politics of Funeral

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে প্রলপন