পাপ যখন বাপকেও ছাড়েনা

কথা হলো আওমীদের ফেলে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ছোবড়া লন্ডনি তারেক মুখে পুরে নিয়েছেন এতে তো বিস্ময়ের কিছু নেই। বরঞ্চ ওটাই ওনার এবং ওনার দলের মূল বৈধতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো জামায়াতে ইসলামীকে কেন সেই ছোবড়া তুলে নিয়ে পোঁদে-মুখে একাকার হতে হবে? কোন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেয়া তো তার যথার্থতার স্বীকৃতি নয়!

নাকি জামায়াতে ইসলামী এখন এরদোগানের রাজনীতির পথ ধরতে চাচ্ছেন? এরদোগান তাঁর রাজনীতির শুরুতে কখনও কখনও নিজেকে কামাল পাশার রাজনীতির প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলেও দাবী করেছিলেন। তা সত্যও বটে! এবং জামায়াত যদি সেই স্পৃহায় একাত্তরের "প্রকৃত" চেতনাকে ধারণ করে অগ্রসর হতে চায় তাতেও কপটতার কিছু নাই।

কারন মুজিব কোন ছার সারা পৃথিবীতে এমন কোন মহাবিপ্লবীর পয়দা হয় নাই যে জনগণকে শোষনের লোভ দেখিয়ে তার শাসনের পক্ষে বৈধতা তৈরী করতে পেরেছে বা ভবিষ্যতেও পারবে। যে মুজিব নিজের শাসনের পক্ষে বৈধতা তৈরীর লোভে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার আলাপটা পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তোলার সাহস পায় নাই, সেই মুজিব যদি বলতো যে তাকে ক্ষমতায় বসানো হলে সে দেশের মানুষকে দুর্ভিক্ষ উপহার দেবে - তখন কি হতো?

সুতরাং দুর্ভিক্ষ, শাসনকার্যে স্বেচ্ছাচারীতা এরুপ আওয়ামী আমলের শত-সহস্র অপকর্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হতে পারে না। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে ছিলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গণমানুষের জাগতিক উন্নয়নের লোক ঠকানো গালগপ্পো। সেই হিসেবে জামায়াতে ইসলামী যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ছোবড়া তুলে নিতে চায় তা এক রদ্দি মাল ছাড়া আর কি?

কিন্তু সেক্ষেত্রে দুটো বিষয় বুঝতে হবে। প্রথমত রাজনীতির সাথে কৌতুকের মিল হলো এই যে ব্যাখ্যা করার পর যেমন কৌতুকের রস চলে যায় তেমনি রাজনীতির কিছু যুদ্ধকৌশল পুনরায় ব্যবহারে তার কার্যকরীতা হ্রাস পাস পায়। দ্বিতীয়ত এরদোগান সারা জীবনে তাঁর লক্ষ্য থেকে কখনও দৃষ্টিচ্যুত হন নাই।

বিংশ শতকের নব্বুইয়ের দশকে ইস্তাম্বুলের মেয়র থাকাকালীন সময়ে টিভি সাক্ষাৎকারগুলোতে যে চামলিজা মসজিদের রুপকল্প তিনি হাজির করেছিলেন একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে তিনি তার বাস্তব রুপ দান করে ছেড়েছিলেন। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের কুফরী-তাগুতি শক্তিগুলোর প্রচ্ছন্ন মদদে গাজী পার্কে বামাতিদের এমনকি ধর্মের ধ্বজাধারী গুলেন চক্রের সমস্ত ষঢ়যন্ত্র স্বত্তেও মহান আল্লাহ তাঁর এই মহৎ কর্মের সফলতা দান করেছিলেন। কারন এরদোগান যেমন হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোন কাবিল নন তেমনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেয়াকে তার যথার্থতার স্বীকৃতি হিসেবে মনে করবার মতো বিভ্রান্তি তাঁর মধ্যে ছিলো না।

প্রকৃত সত্য হলো এরদোগান উসমানীয় সিলসিলা যেভাবে ধারণ করতে পেরেছেন উসমানীয় রাজবংশের বর্তমান পারিবারিক উত্তরসূরীদের পক্ষেও তা ছিলো অসম্ভব। এরদোগান উসমানীয় সিলসিলাকে ধারণ করেছেন বটে কিন্তুু তাতে বিলীন হন নাই। বরং তাতে নিয়ে এসেছেন স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। সূচনা করেছেন এরদোগানীয় সিলসিলার।

এরদোগান যদি নিজেকে কামাল পাশার প্রকৃত উত্তরাধিকারী দাবী করেও থাকেন তথাপি তাঁর কেবলা ছিলো ঠিক। তিনি জানতেন আনিতকাবিরে এথেনীয় এক্রোপোলিসের আদলে নির্মিত কামাল আতাতুর্কের সমাধি মন্দিরের পৌত্তলিক সিলসিলা। জানতেন বলেই তিনি আধুনিক তুর্কিদের কিবলা আঙ্কারা থেকে পুনরায় ঐতিহাসিক ইস্তাম্বুলে ফিরিয়েছেন। যাকে ঘিরে থাকা সপ্তপর্বত সমূহের চূড়ায় নির্মিত উসমানীয় সুলতানদের মাজারগুলো শত শত বৎসরব্যাপী তার অধিবাসীদের প্রেরণা যুগিয়েছে, আশ্বস্থ করেছে। সেই ইস্তাম্বুলে এরদোগান চামলিজা মসজিদ নির্মাণ করেছেন এমন উচ্চতায় যা উসমানীয় সুলতানদের মাজারগুলোকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো সুদীর্ঘ দেড় যুগ ধরে আওমীদের অপশাসন এবং বাংলাদেশে রাষ্ট্র্যের নামে বিগত তিপ্পান্ন বৎসর ধরে গড়ে তোলা যে শোষণবাদী, শঠতার বন্দোবস্ত তার অসারতা জনগনের নিকট দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হবার পরও কেনো জামায়াতে ইসলামীকে পুনরায় তার দায়ভার গ্রহণ করতে হবে? বিএনপির তো এছাড়া গত্যন্তর নাই। কিন্তু জামাত কেনো?

জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি-ই এমন যে, কি '২৪, কি '৪৭, এমনকি মাওলানা মওদূদী রহ: এঁর ওপরও তা নির্ভরশীল নয়। বরং তার রাজনীতি ওমর আল-ফারুক রা: এঁর সেই স্বপোলব্ধির প্রতিফলন যাতে আরবদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিলো এই বলে যে একমাত্র ইসলামের জন্যই মরুচারী নিগৃহীত আরবেরা পুনরায় জগৎবাসীর নিকট সম্মানার্হ হয়ে উঠেছিলো। সুতরাং ইসলাম ব্যতিরেকে তাদের কোন পরিচয় নাই। বৈধতা নাই।

তেমনি নমশূদ্র বাঙ্গালীরও জাত্রোত্থান ঘটেছে ইসলামের বরাতেই। আজ যদি তার অধ:পতন হয়ে থাকে তবে তা ঘটেছে ইসলামের ঘাটতিতে। তার সমাধানও রয়েছে ইসলামের পূর্তিতে। অন্য কিছুতে নয়। তার কিবলা মক্কা শরীফে, মদীনা শরীফে, বায়তুল মাকদিসে। পৌত্তলিকদের অনুসরণে গড়ে তোলা শিখা অনিবার্ণ, "শহীদ" মিনারের বেদী, কিংবা স্মৃতিসৌধে নয়। এসব বরঞ্চ উপমহাদেশীয় তাগুতি চক্রের নতুন চক্রান্ত। যার পূর্ব রুপ ছিলো দ্বীনে এলাহী। দ্বীনে এলাহী ফেল মেরেছে। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও মৃত্যু শয্যায়। তবে কেনো শুশ্রূষা পূর্বক এই নরঘাতক, রাষ্ট্রঘাতককে পুনর্জীবন দানের প্রচেষ্টা?

জামায়াতে ইসলামকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে মুক্তিযুদ্ধ এমন এক বামাতি পাপ যে তার বাপদেরও ছাড়েনি। বরঞ্চ বাংলাদেশে বর্তমানে আমি যতো সমস্যা দেখি তার মূলে দেখতে পাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, এই চেতনা-ই যদি বাংলাদেশের  মূল সমস্যা হয় তবে পাকিস্তানেরও প্রায় একই অবস্থা কেনো? ওখানে তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নেই! তাদের বলি, ওখানেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আছে। এই চেতনা-ই এতোদিন তুরস্কের মুসলমানদের তাগুতের বশীভূত করে রেখেছিলো। এই চেতনার আফিমে বুঁদ হয়েই ইরানী ও আফগানিরা ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলো। এই চেতনাই বাদ বাকী মুসলিম জাতিরাষ্ট্রসমূহকে এখনও কুরে কুরে খাচ্ছে।

এই চেতনার নাম গায়রে ইসলাম। এই চেতনার শক্তিতেই তাগুতি ও কুফরী শক্তিসমূহ মুসলিম জাতিসমূহের ওপর জেঁকে বসেছে। বিংশ শতকের চল্লিশের দশকে জন্ম নেয়া জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক প্রকল্প-ই ছিলো এই চেতনার মূলোৎপাটন করে উম্মতে মোহাম্মদীকে কলেমার সূত্রে একত্র করা। ইসলামী পুনর্জাগরণের এটাই একমাত্র পথ।

পুনশ্চ: জামায়াতে ইসলামী নিয়ে বিশেষ করে তার সমালোচনা করে, তার রাজনীতির খন্ডন করে কিছু বলতে দ্বিধায় পড়ে যাই। কেননা প্রায়শ তা ইসলাম বিদ্বেষীদের খোরাক হয়ে যায়। তদুপরি বাংলার এই অজাতদের দেশে জামায়াতে ইসলামীর গর্ভ থেকে যে পরিমাণ আবালের মিসকারাজ (miscarriage) হয়েছে তাতে জামাতের অনিষ্ট সাধনে বিশেষ শত্রুর প্রয়োজন নাই। তার উচ্ছন্নে যাওয়া পয়দা গুলোই যথেষ্ট।

এক্স-শিবির নামক নচ্ছারদের নিকট থেকে এমন কোন আলাপ আমি শুনি নাই যা বিশ বছর আগে শোনা যেতো না। এখন যেমন জামাতের বর্তমান নেতৃবৃন্দকে খাটো করে, তাচ্ছিল্য করে আঁতলামী করার, নিজেকে জাহির করবার প্রানান্ত প্রচেষ্টা করা হয় এই প্রবণতা পূর্বেও আমি লক্ষ্য করেছি। এটাই বাঙ্গালীয়ানা। এটাই জাত বাংলার বৈশিষ্ট্য। এমনকি জামাত-শিবিরের লোকদের নিকট থেকেই শুনেছি যে নিজামী-মুজাহিদ সাহেবরা নাকি মন্ত্রণালয় চালাতে পারছেন না! মুজাহিদ সাহেব নাকি র এজেন্ট। এই হইলো অবস্থা।

জামাতের কেবলমাত্র মওদূদী ও সাঈদী সাহেব ছাড়া আর কারও ব্যাপারেই আমার তেমন ধারণা কিংবা চিন-পরিচয় না থাকলেও জামাইত্তাদের এহেন বাংলা মার্কা কথা চিনতে আমার তখনও তেমন বেগ পেতে হয়নি। কারন যে দলের শীর্ষ নেতাদের মন্ত্রণালয় চালাবার যোগ্যতা নাই সে দলের নেতাকর্মীদের মুখের কথাকেই বা আমি কিভাবে আমলে নিতে পারি? একটা দলের অসংখ্য নেতাকর্মী কোন স্তরের বেকুব হলে দলের শীর্ষে একজন র এজেন্ট-কে নেতা হিসেবে নির্বাচন করতে পারে?

কিন্তু কালের পরিক্রমায় এইসব ব্যক্তিরাই এখন পূঁজনীয় হয়ে উঠেছেন। হানিফ সংকেতের একটা কৌতুক ছিলো যে তিনি সমস্ত পদ-পদবীর মধ্যে "মরহুম" উপাধিকেই বেশী পছন্দ করেন। কারন মরে গেলে এদেশে সবাই হঠাৎ ফেরেশতা বনে যায়। কথায় বলে যে আমজনতার কাছে একজন সফল বিপ্লবীর যতোটা না আবেদন থাকে প্রতিরোধ যুদ্ধে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া একজন বিপ্লবীর আবেদন থাকে তার চেয়ে ঢের বেশী।

এক্স-শিবিরের ছ্যাবলামী ছাড়াও জামাতের বিরোধীতা না করতে চাওয়ার আরেকটা কারন হলো যাদের দুর্দিনের সহায় হতে পারি নাই, তাদের ভরামৌসুমে দুর থেকে উপদেশ দেয়ার ধৃষ্টতা না দেখানোর বিচারবোধ। আমি পূর্বেও বলেছি পেশাগত পরিধির বাইরে আমার লেখাপড়া প্রাশয়ই নিজের কৌতুহল মেটানোর জন্য। ক্ষেত্র বিশেষে উদ্বেগ কিংবা হতাশার বহি:প্রকাশ। বলতে না চেয়েও আমি বলি। কারন আপনারা কেউই তা বলেন নাই। যার উচ্চারন আবশ্যক বলেই অন্তত আমার নিকট প্রতীয়মান হয়েছিলো।

Popular posts from this blog

বামাতি রাজনীতি থেকে উৎসারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ

The Politics of Funeral

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে প্রলপন