সংবিধানতন্ত্রের বুজরুকি
ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে যে খোদাদ্রোহীতার সূচনা হয়েছিলো বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে তা এক রকমের চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। সমস্যা দেখা দেয় তখনই যখন "পুরানা বন্দোবস্তের" বিরুদ্ধে আঙ্গুল তোলা "বিপ্লবীরা" নতুন বন্দোবস্তের খোদা বনে যাবার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। কেননা এটাই ধর্মীয় বন্দোবস্ত নামে পরিচিত। কেউ একজন নবী হিসেবে আবির্ভূত হন। মানুষ তাঁর প্রদত্ত বিধানবলীকে ঐশ্বরিক জ্ঞান করে তা অনুযায়ী আমল করে। কিন্তু খোদায়ী বন্দোবস্তের কবর রচনার পর দেখা গেলো একেবারে মৌলিক সিদ্ধ-নিষিদ্ধ অর্থাৎ হালাল-হারামের বিষয়ে খোদ বিপ্লবীরাই এক হতে পারছেনা। তাছাড়া যে মনুষ্যকুল নবী-রসুলগণকে শরীয়ত প্রণেতা হিসেবে মান্যগন্য করে এসেছে তারা কেনো এমন সব ব্যক্তিদের প্রদত্ত আইন মান্য করবে যারা নিজেরাই নিজেদের সৃষ্ট জীবন-দর্শন, কালা-কানুনের ব্যাপারে সংশয়যুক্ত ও অনৈক্য?
সুতরাং আদম সন্তান পয়দা হওয়ার মতো সংবিধানও পয়দা হয়ে গেলো। শুধু তাই নয় অনিবার্য যৌক্তিক কারনেই সংবিধান ও তথা-কথিত জাতি-রাষ্ট্র্যের ওপর খোদায়ী বৈশিষ্ট্য সমূহ আরোপ করা হলো। কিন্তু কথায় বলে না, ট্যাঁএঁএঁ করে জন্ম নিয়েও মানুষ হতে পারলাম না। তদ্রুপ সংবিধান কিংবা রাষ্ট্র্যও খোদা হতে পারেনি। পারার কথাও নয়। কেননা রাষ্ট্র্য যদি হয় একটি জাতির মানসকল্প তবে সংবিধান তার ইচ্ছাকল্প। ব্যস। অতোটুকু। এর বেশী কিছুই নয়। অর্থাৎ মানুষ ও মানব জাতির যে সীমাবদ্ধতা সংবিধান ও রাষ্ট্র্যেরও সেই একই সীমাবদ্ধতা।
কিন্তু আপনাদের প্রায় বলা হয় যে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে! এটা কেনো বলা হয়? এ কারনেই বলা হয় যে এই বিদ্যা মুখস্ত করেই এরা ডাবল স্ট্যান্ড করেছে। কাবিল হয়েছে। কারন যদি অক্সফোর্ড-কেম্ব্রিজ করে আসা গরিবের ঘরের এই মেধাবীদের সেই বুঝজ্ঞান থাকতো তাহলে তারা ধরে ফেলতো যে ধারাবাহিকতা একটা চিরন্তন স্বত্তার সিফাত। অর্থাৎ মহান আল্লাহর-ই সিফাত। তিনি অনাদি। অনন্ত। ধারাবাহিক। ঠিক এই কারনেই আদম সৃষ্টির সময় থেকেই তাঁর শরীয়তের কোন বিচ্ছেদ ঘটেনি। ঘটবার সুযোগ নাই।
কিন্তু সেকুলার মানস তো খোদার মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে বসে আছে! আর তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর বিধানবলীরও মৃত্যু হওয়াটা যৌক্তিক। অন্তত মানুষের গ্রহণযোগ্যতার বিচারে। কাজেই কোরআনের জায়গায় সংবিধান বসানো হয়েছে। বিপত্তি এখানেই যে কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব মহান আল্লাহ নিজে নিয়েছেন। কিন্তু সংবিধান রক্ষা করবে কে? মানুষকেই তা করতে হবে। কিন্তু মানুষকে রক্ষা করবে কে? কেউনা!
কাজেই এক বিপ্লবের ঢেউয়ে যে সংবিধান আসে পরবর্তী বিপ্লবের ঢেউয়ে সেই সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলা হয়। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে এই অনিবার্য বাস্তবতারই একটা যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করবার এক হাস্যকর প্রচেষ্টা করা হয় কেবল। একটি সংবিধানের মৃত্যুর পর অন্য একটি সংবিধান জন্ম লাভ করবার আগ পর্যন্ত যে অন্তর্বর্তীকালীন শাসন (interregnum) তাকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে বাঁচাবার তাগিদেই এই ধারাবাহিকতা।
কেননা যে সেকুলার মানস খোদায়ী বিধানকে প্রত্যাখ্যান করেছে তার জন্য তো কোন সর্বজনীন আচরণবিধি (code of conduct) নাই। সংবিধানকেই যখন বৈধতার চূড়ান্ত মানদন্ড বলে স্বীকার করে নেয়া হয় তখন সেই সংবিধানের অনুপস্থিতি কেবল নৈরাজ্যেরই জন্ম দিতে পারে। এ কারনেই দেখা যায় ক্রান্তিকালীন সময়ে সংঘটিত "অন্যায়" সমূহের একটা দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে তা কেবল বিজয়ী পক্ষের জন্যই সুনির্দিষ্ট। তা ছাড়াও ক্রান্তিকালীন সময়ে তথাকথিত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা ব্যতিরেকে সংবিধান সর্বস্ব জাতিগোষ্ঠী সংবিধানের অনুপস্থিতিতে তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ সম্পদের মালিকানা কিংবা সম্পদ হস্তান্তরের মতো মৌলিক কার্যক্রমগুলো অসংজ্ঞায়িত হয়ে পড়ে।
সংবিধানতন্ত্রের বুজরুকি-টা এখানেই। সে যে সিফাতের অধিকারী নয় খোদায়ী স্বত্তার অনুপস্থিতিতে তার ওপর সেই সিফাত চাপিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় থাকেনা। এবং চাপিয়ে দেবার পর সে চেগিয়ে যায়।
খোদায়ী সিফাতের ঠিক এই বোঝাপড়ার অভাবেই সেকুলার বুদ্ধিজীবিরাও আঁতলামি করতে গিয়ে চেগিয়ে যায়। হাসিনার আমলে "আমি খাড়ায় যামু, আমনে বসাই দিবেন" বন্দোবস্তে আওমী বিরোধীতা করে জনপ্রিয়তা পাওয়া আঁতেল-টি জুলাই'২৪ উত্তর নেংটা হয়ে গেলো। তার প্রশ্ন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনরায়ের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করতে পারবার সুযোগ থাকা উচিত কিনা? এ যাবৎ ইচ্ছা করেই আমরা উত্তর দেয়া থেকে বিরত থেকেছি। বানলাদের দৌড় কোন পর্যন্ত এটা দেখানোর জন্য।
দুই বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। কেউ যে তার উত্তর দিতে পারেনি শুধু তাই নয়, এই পুরো দু দুটো বৎসর ধরেও সে নিজে এর উত্তর খুঁজে বের করতে পারে নাই। তাই কদিন আগে সে আবারও দাবী করে বসলো যে গণতন্ত্রের নাকি কিছু "নর্মস" আছে। যদি কোন গোষ্ঠী সেই সব নর্মস না মানে তাহলে গণভোটে সংখ্যাধিক্য প্রাপ্তির পরও তার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর যোগ্য নয়।
তার যদি নূন্যতম ঘিলু থাকতো তাহলে অন্তত সে এতোটুকু উপলব্ধি করতো যে অদৃশ্যমান খোদায়ী স্বত্তা চূড়ান্ত কার্যকারক (ultimate cause) হলেও মানুষই দৃশ্যমান কার্যকারক (immediate/proximate cause)। অর্থাৎ আপনে যদি সংবিধানে খুব কঠিন করে লিখে দেন যে, "এই সংবিধান অনুযায়ী কোন ক্রমেই জঙ্গীদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাইবে না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যাধিক্যেও না" - তাহলেই কি ক্ষমতার এই হস্তান্তর ঠেকানোর নিশ্চয়তা প্রদান করা যেতো? তাহলে দেশে-বিদেশে "জঙ্গী"-রা যে বিভিন্ন সময়ে সংবিধানের পুটু মেরে ক্ষমতা গ্রহণ করে নিলো তার কি করে সম্ভব হলো? শোনেন মিঞাঁ, জাউরাদের জন্য মাইরের ওপর সংবিধান নাই।
প্রকৃত বুঝ হলো এই যে সংবিধান একটি ইচ্ছাকল্প মাত্র। যখন একদল মানুষ একটি নির্দিষ্ট জীবনার্দশে বিশ্বাস করে, নির্দিষ্ট কিছু বিধানবলী কিংবা রাষ্ট্র্যকল্প বিশ্বাস করে তখন তারা একটি সংবিধানের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছার একটা লিখিত রুপ প্রদান করে। তাদের সংবিধানের বৈধতা প্রধানত তাদের নিকটেই। তবে তাদের এই বৈধতার সম্প্রসারণ ঘটতে পারে যদি তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে অন্যদের নিকট তার যৌক্তিকতা কিংবা কার্যকরিতা তুলে ধরতে পারে।
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে যদি একটি গণতন্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী জয়লাভ করে তাহলে বুঝতে হবে যে সেই গণতান্ত্রিক মানসের মৃত্যু ঘটেছে ভোট গ্রহণের বহু আগেই। সেক্ষেত্রে সংবিধানের যে আদি ভিত্তিমূল তাতে বিশ্বাসী গোষ্ঠী সমূহ হয়তো জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে এক রকমের ছায়ারাষ্ট্রয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ সাধতে পারে কিন্তু তাতে ক্ষমতার হস্তান্তর ঠেকানো যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নাই। কারণ গণভোটের রায়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই সংবিধানের মৃত্যু হয়েছে।
এ কারনেই ইসলামী শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্র-রাজতন্ত্র ইত্যকার কোন সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র্যতন্ত্র কেন্দ্রিক নয়। এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নেও তার কোন বৈধতার বিকার নাই। তার বৈধতা বিশ্বাস ও তার বাস্তবায়ন কেন্দ্রিক। অর্থাৎ সংবিধান কোরআনের বসবর্তি কিনা? শাসককূল আল্লাহর বিধানের অনুসারী কিনা? যদি হয়, তবে তা যেই পদ্ধতিতেই হোক, তা হালাল। আর নাহলে তার মূলোৎপাটন করা প্রতিটি মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য।