হাঁটাহাঁটি

একসময় ধানমন্ডি লেকে প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটতাম। দশ চক্কর। গুগল ম্যাপের হিসেবে ৬.৪ কিলোমিটার। হাঁটতাম খুবই দ্রুত গতিতে। হাঁটতে হাঁটতে পা ফুলিয়ে ফেলতাম। কখনো কখনো রক্তপানিও জমে যেতো। একটা ভালো কেডসের গুরুত্ব সম্পর্কে তখনও হুঁশ হয় নাই। যখন হুঁশ হলো তখন বেশ ভালো দামের একটা কেডস কিনে জয়বাংলা হয়ে গেলাম। মারো মুঝে মারো।

আমি জীবনে যতো কেডস কিনেছি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলো বাটা কোম্পানীর একটা জুতো। মাঝ খানে ক'বছর সেটা বাজার থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছিলো। কবে যেনো দেখলাম আবার ফিরে এসেছে। বাটার কেডস কেনার জন্য বেরিয়ে এপেক্সের স্যান্ডেল কিনে নিয়ে আসলাম। কিএক্টাবস্থা!

এপেক্স থেকে যে কয়টা জুতো আমি কিনেছি, মারা খেয়েছি। পায়ে ফোস্কা পড়ে। সহজে ছিঁড়ে যায়। একবার হলো কি বৃষ্টির জ্যামে মোটরবাইকে বসে আছি। হঠাৎ পায়ে পানির স্পর্শ অনুভূত হওয়ায় ভালো করে তাকিয়ে দেখি জুতোর তলা ফেঁড়ে হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ঐ যে একটা গান আছেনা, আহা কি বিস্ময়ে দেখছো তু-মি আমায়!  ওরকম অবস্থা।

কিন্তু তারপরও এপেক্স কিনলাম কেনো সেটাই প্রশ্ন। শুনেছি বাটা এহুদীদের কোম্পানী। সেটা কি কারন হতে পারে? এপেক্স কাদের কোম্পানী? যদি আওমী কিংবা ভারতের হয় তখন? নগ্ন পদে হাঁটবো?

হাঁটা-ও যে একটা নেশা হতে পারে এইটা আমি অনেক দিন পরে বুঝেছি। যখন দেখলাম হাঁটাহাঁটির সাথে লেখক-দার্শনিকদের সম্পর্কটা খুবই পুরনো। অথচ এই বিষয়টা আমার না জানার কথা নয়। মাধ্যমিকে পড়বার সময় যখন ঢাকা শহর হিমু জ্বরে আক্রান্ত তখন প্রায়ই মানিক মিঞাঁ এভিনিউ থেকে আসাদ গেট হয়ে শেরে বাংলা নগরের রাস্তা দিয়ে ঘুরে একটা চক্কর দিতাম। চক্কর শেষে সংসদ ভবনের সামনের লাল চত্বরে ব্যয়াম করতাম। তখনও দেশ সিকিউরিটি স্টেট হয়ে ওঠেনি। গণপরিসর সংকুচিত হয়ে যায়নি।


 

তো এরকম একদিন দুপুরে মানিক মিঞাঁ এভিনিউতে হাঁটার সময় "হাঁটাবাবা"-কে দেখলাম। জটাধারী। নোংরা। স্পষ্টতই বিকারগ্রস্থ। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো তার পদব্রজের অনুসারীগণ কিন্তু পোশাকে আশাকে পরিপাটি। সমাজের এলিট। ডিগ্রী অলা। পয়সা অলা। পদ-পদবী অলা। ওঁচা শ্রেনী। তারা কেনো এর পেছনে হাঁটছে?

না পাঠক। এরা বিকারগ্রস্থ নয়। আমার বিবেচনায় এদের একাংশ গাড়োল আরেকাংশ ঘড়েল। যারা গাড়োল তারা জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে অতিষ্ঠ হয়ে পরিত্রাণের আশায় বাবার কাছে এসেছে। আর এদেরকে ঘোল খাওয়ানোর জন্য এখানে নিয়ে এসেছে ঘড়েল প্রকৃতির লোকেরা। এই লোকেরা খুব ভালো করে জানে যে বাংলাদেশ-টা হলো বাবার কারবার।

এদেশের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যেহেতু পিতৃহীন তাই এই সমাজ, এই রাষ্ট্র্য সব সময় ড্যাডি ইস্যুতে ভোগে। বাবার কারবার। তবে এই ড্যাডি ইস্যু যে শুধু তাবিজ-তুমার, হাঁটাবাবা, ময়লাবাবা, ল্যাংটাবাবা প্রভৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তা কিন্তু নয়। দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে যেভাবে জাতিকে দিশা প্রদানের মাধ্যমে ঘোল খাওয়ানো হয় সেটাও কিন্তু এই বাবার-ই কারবার।

আশি-নব্বুইয়ের দশকে ভারতীয় কোম্পানী এপটেক-কে আমদানী করা হয়েছিলো বিশ্ব বাজারে বিলিয়ন ডলারের ডেটা এনট্রি ব্যবসার মুলা দেখিয়ে। কাজের কাজ হলো এই যে এপটেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আন্ডারগ্র্যাডদের পাওয়ার পয়েন্ট শিখিয়ে টাকা নিয়ে ভেগে গেলো। মাঝখান থেকে লাভ হলো ঐ কোম্পানীর এবং ঐ কোম্পানীকে দেশে নিয়ে আসা মধ্যস্বত্তভোগীদের।

কথা হলো এই যে বাবার কারবার করে একটা শ্রেনী জাতে উঠে গেলো এরপর এরা তাদের পুঁঞ্জিভূত সেই অর্থ দিয়ে ঠিক কি করবে বলে আপনাদের ধারণা? সেই অর্থ দিয়ে তারা দেশে বাবার কারবার-টাকে বড়ো করবে। তাদের বংশধরদের মধ্যে যারা বাংলা রয়ে যাবে তারা বংশপরম্পরায় এ দেশেই সেই কারবার চালিয়ে যাবে। আর যারা একটু সফট ঘড়েল, মানে মনে করেন যে ছাংগেসকিতি-একাডেমি করা যেগুলো, তারা এনরেজি মিডিয়াম পড়ে, টোয়েফল-জিআরি দিয়ে স্টুডেন্টশীপ নিয়ে এরুপ-এমেরিকায় পাড়ি জমাবে। যদি পাস দিতে পারে তাইলে সব্বোনাশ! যদি পাস দিতে না পারে তাইলেও সব্বোনাশ।

পাস দিতে পারা গুলো দেশে ফিরে এনরেজিতে বাবার কারবার করবে। ড্রপাউট কিংবা ফেল করা গুলো বিদেশে বসে বাবার কারবারে যুক্ত হবে। এটুবে গালগপ্পো জুড়ে দেবে। এই শালা বিল গেইটসের জন্য! না হয় আরেকটু হলেই তো সে বিল ঘেঁটু হয়ে যাচ্ছিলো। এই শালা ল্যারি পেইজ তার শব পরিকল্পনা ভেস্তে দিলো। না হলে সেও তো মনরো পার্কের গ্যারেজে বসে ঘুঘু বানাচ্চিলো। এট্টুর জন্য ওলো না মাইরি!

তবে এবার হবে। হতেই হবে। চাকা ছাড়া চলবে গাড়ি। বাতাস ছাড়া চলবে বিমান। সুতরাং বন্দুরা যার যার ওবোস্তান তেকে টাকা-ফুইশা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো। কখনোই ভাববে না যে দেশ আমাকে কি দিলো? বরং সব সময়ই মনে করবে আমি দেশকে কি দিলাম? সুতরাং বাইয়ারা! আপুরা! দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে যাও। লেডিস ফার্স্ট! একথাও কি বলে দিতে হবে রে- সোনা-!

আমার দিকে তাকায়া লাভ নাই। আমার লাইনে দাঁড়াবার সময় নাই। আমি হেঁটে চলছি। আমি হেঁটে চলবো অনন্তকালের চক্করে। যখন দেয়া শেষ করে তোমরা নি:শেষ হবে তখন অনন্তকালের ঘুর্ণিপাকে হয়তো তোমাদের সাথে দেখা হয়েও যেতে পারে। ধানমন্ডি লেকের চক্করে দেখা সেই গজব-বাবার মতো। প্রায়ই দেখতাম ধানমন্ডি-৩২ এর দিকে তাকিয়ে অনবরত গজব দিয়ে যাচ্ছেন। দুই হাত উপরে তুলে অভিশাপের ভঙ্গিতে তড়িৎগতিতে মাটির দিকে নামিয়ে ফেলছেন। হয়তো তোমরাও দিবে। অন্য কোন ইমারতের প্রতি। অন্য কোন বাবার কারবারে। অন্য কোন বাবাদেরকে। আমার হাঁটা কিন্তু থামবে না! চলবে ঘূর্ণাবর্ত দরবেশদের (whirling dervishes) মতো।


 

এই ভঙ্গির জন্য কি কোন শব্দ আছে? আমি শুনেছি যে ভাষায় যতো বিশেষ্য বাচক শব্দ থাকে সেই ভাষা ততো সমৃদ্ধ। যে কারনে আরবী ভাষায় নাকি অসংখ্য বিশেষ্য বাচক শব্দ বিদ্যমান। কেবল সিংহের জন্যই শব্দ আছে শতাধিক। গুড়া সিংহ, বুড়া সিংহ, ধাড়ী সিংহ, মারি সিংহ - প্রত্যেকটার জন্য একেকটা আলাদা শব্দ। বিশেষ্য বাচক শব্দের সুবিধা এই যে তা ভাষার বর্ণনামূলক (descriptive) চর্চা-কে সংক্ষিপ্ত ও ভাবপূর্ণ (expressive) করে তোলে। যদি 'চিকিৎসক' বলে কোন শব্দ না থাকতো তবে প্রতিবার 'চিকিৎসক' বোঝাতে একটা বর্ণনা দেয়া লাগতো।

এই যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অবিরত ঘূর্ণন এ নিয়ে হয়তো পরে লিখবো। মনে করেন বোরীয় মডেলে নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ইলেক্ট্রন সমূহের ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে অনন্ত ঘূর্ণন, কিংবা মহাবিশ্বে নক্ষত্র সমূহকে কেন্দ্র করে গ্রহ সমূহের ঘূর্ণন যেনো আল্লাহর আরশ-কে কেন্দ্র করে প্রতি নিয়ত যে নতুন নতুন সত্তুর হাজার ফিরিশতা তাওয়াফ করেন তারই লহর প্রভাব (ripple effect)।


ভেবে দেখলাম যদি নাক বরাবর হাঁটতাম নিশ্চিত মক্কা পৌঁছে যেতাম!