মাইনাস টু নিয়ে রাজনৈতিক প্রলপণ

জাইঙ্গা জেনারেশন নিয়ে আমার কোন আদিখ্যেতা নাই। এমন কি শিবির নিয়েও নাই। কোন কালেই ছিলো না। আমার মুগ্ধতা ছিলো জামায়াতে ইসলামী নিয়ে। ২০০০-২০০১ সালে প্রথম স্ব-উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমে গিয়ে জনে জনে ধরে জামাতের অফিস খুঁজতে লাগলাম। ভাগ্যগুণে খুব সম্ভবত তার প্রথম মানুষটি ছিলেন শিবিরের। তাও একেবারে কার্যকরী পরিষদের সদস্য। নাম মনে নাই। ম দিয়ে হবে। মুহিব বা মাহিন এই জাতীয়। তখনও আওমী সরকারের মুক্তিযুদ্ধের চোটে জামাতের পাচা লাল। সুতরাং শিবিরের ভাইয়ের চোখ সরু হয়ে গেলো। ডিবির লোক নাকি? কিছুক্ষণ আলাপের পর ভাই বুঝলেন আমি মুরগী হইতে আসছি। একদম কারাভাজ্জিওর অঙ্কিত ছাগলটার মতো। শিবিরের দাওয়াতী বইয়ের "টার্গেট" আপনা থেকে এসে হাজির। এর চাইতে বড়ো মিরাকল আর কি হইতে পারে?

 

 

তো ভাই আমারে এভাবে আওমী আমলের দু:শাসন-নিপীড়নের মাঝে জনজনে ধরে জামাতের অফিস খোঁজার যে নিরাপত্তা ঝুঁকি তা বোঝালেন এবং বললেন যে ভাগ্যগুণে আমি পুলিশের হাতে পড়ি নাই। পরে জামাতের বদলে শিবিরের অফিসে নিয়ে গেলেন। কি কথা হয়েছিলো এতোদিন বাদে আর মনে নাই। তবে এক ভাই এসে আলাপ জুড়িয়ে দিলেন। নতুন বেল্ট কিনেছেন। কেমন হয়েছে, সেই আলাপ। কৈশরের টগবগে রক্ত নিয়ে এছলামি রেঁনেছা কিংবা ইরানী বিপ্লবের আলাপ শুনতে আইসা শুনতেছি আটপৌরে সাংসারিক আলাপ। কেম্নেকি?

যেদিন প্রথম জামাতের অফিসে যাই মাওলানা আব্দুস সোবহান সাহেবের সাথে দেখা। ওনাকে তখন চিনতাম না। সাক্ষাতেও মনে হয় নাই এই লোক এত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য এবং অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাতা-উদ্যোক্তা। একেবারেই নিরহংকার, নিরীহ প্রকৃতির, মৃদুভাষী লোক মনে হয়েছিলো। সেই আলাপও মনে নাই। তবে আবছা মনে আছে যে আমি যখন শিবিরের বদলে জামাতে যোগদান নিয়ে গোঁ ধরলাম উনি চুপ মেরে গিয়েছিলেন। মনে হয় বুঝতে পেরেছিলেন এইটারে দিয়ে হবে না। বাতিল মাল।

জামাতের সাথে কাজ না করতে পারার একটা আক্ষেপ আমার আছে। থাকলেও করার কিছু নাই। এতোদিন পর এসে আমার উপলব্ধি হলো আমি ঠিক ঐ টাইপ না। মানে অন্তত বাংলাদেশে মাঠের রাজনীতি করার টাইপ না। তবে জিহাদের ময়দানে কুফরী-তাগুতি শক্তির প্রতি একটা ঢিল হলেও ছোঁড়ার খাহেশটা এখনও রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে নিরীহ-নিরস্ত্র মুসলমানদের ওপর হত্যাযজ্ঞ দেখলে সেই খাহেশ ঝলসে ওঠে। সুযোগের অপেক্ষা।


জুলাই'২৪ এ যে জেনজির উত্থান তাদের ব্যাপারে আমার খুব একটা উচ্চাশা বা উচ্চধারণা নাই। শিবির বাদে। জাইঙ্গা জেনারেশন এমন কোন আলাপ হাজির করতে পারে নাই যা তাদের আওমী-বামাতি বাপ-দাদারা করে নাই। বরং আমি সেই একই উচ্ছন্নের রাজনীতি, লাফাঙ্গার রাজনীতি, উন্মাদনার রাজনীতির চর্বিত চর্বন-ই দেখতে পাচ্ছি। এই জেনারেশন মুজিব বিরোধী হলে কি হবে এদের অনেকের মধ্যেই মুজিবের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। তবে সেই ভরাট গলাটা নাই আরকি। এদের ওপর বামাতি নচ্ছার রাজনীতির ধ্বংসাবশেষের লক্ষণও স্পষ্ট। পার্থক্য শুধু এই যে এদের ক্রেজ পূর্ব যুগের গুয়েভরা থেকে বর্তমান যুগের এছলামে এসে ঠেকেছে।

মুজিব আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। কিন্তু মুজিব বানানোর কারিগরেরা হাল ছাড়ে নাই। শেরে বাঙ্গু, ময়লানা ভাসানী এমন কি তাতেও কাজ না হলে উপায়ান্তর না দেখে খৃস্টান ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত একজন ছেকুলার মাদারে পাকিস্তানের কর্মবীর বাঙ্গালী স্বামী-কে পর্যন্ত হাজির করা হচ্ছে। ঘুরে ফিরে সেই পুরান মাল দিয়ে নবদ্যোমে নষ্টামী করার পরিকল্পনা। একসময়কার রাজনীতির রহস্য পুরীষ-দের প্রেতাত্মা বর্তমানের মাস্টারমাইন্ডদের ওপর ভর করেছে।

তবে সবচাইতে বিপদজনক ব্যাপার হলো বিএনপি-জামাত কে তাচ্ছিল্য করবার, তাদের বাতিলের খাতায় ফেলে দেবার সুইসাইডাল প্রয়াস। যদি জেনজির নিজস্ব রাজনীতি থাকতো তাহলে অন্তত এটা মানা যেতো। যদি তাদের রাজনীতি যুগপোযুক্ত হতো তাহলে তাদের দু হাত খুলে আলিঙ্গন করাটা অত্যাবশকীয় হয়ে পড়তো। কিন্তু ঘটনা তো তা নয়। জুলাইয়ে তাদের সফলতা দৈবক্রমিক। জুলাই পরবর্তীতে তাদের বয়ান বিক্ষিপ্ত, আনকোরা। এই যে তারা রাজনৈতিক জ্ঞান ও বোধশূন্য হয়েও রাজনীতির ওপর হামলে পড়েছে তার পরিণতি মুসলিম লীগ, আওমীলীগ কিংবা বামাতিদের চাইতে ভিন্ন হবে না।

তা না হলো। কিন্তু বর্তমানের রাজনৈতিক কাঠামোকে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের অজান্তে দেশের রাজনীতিকেই ধ্বংস করে ফেলছে। ফলত: তথাকথিত মাইনাস টু নামে দেশকে রাজনীতি শূন্য করবার যে অপচেষ্টা সেই আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়া হচ্ছে। দেশের রাজনীতির দুর্দশার অজুহাত দিয়ে দেশের দখল তারাই নিয়ে নিচ্ছে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের সহায়ক। ফলত: স্রেফ চাকুরেরা দেশের মালিক মনে যাচ্ছে। তারা নিরাপত্তার নামে দেশের মানুষকে ফিঙ্গার দিচ্ছে। রাজনীতির পরিশীলনের নামে গণমানুষের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে। দেশের মানুষের দুর্নীতিপ্রবণতা ও অদক্ষতার অভিযোগ তুলে দেশকে বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। অল থ্রু ফার্স্ট ক্লাস বেকুবদের মতে ছাট্টিফিকেট দিয়ে নাকি রাজনীতি করতে হবে!

দেশের তরুন-যুবাদের বলবো, জামাত-শিবিরের সাথে লিয়াঁজো করে চলো। তাদের সাথে থেকে রাজনীতি শেখো। কারন দেশে এখন নতুন করে রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নাই। একশ বছর আগেও ছিলো না। বিলাতীরা ছোবড়া বানিয়ে দিয়ে গেছে। এর থেকে উত্তরণের আলাপ নিয়া পুরো উপমহাদেশ জুড়ে বহু সময়, শ্রম, ও বুদ্ধিবৃত্তি ব্যয় হয়েছে। সেই সমস্ত আলাপের মধ্যে মাওলানা মওদূদী রহ: এঁর উত্থাপিত রাজনৈতিক তত্ত্বের চাইতে উৎকৃষ্ট আলাপ আমি আর পাই নাই। তাই আমার উপদেশ তোমরা অন্তত শুরুটা ঐটার ভিত্তিতে করো।

গাযযার গণহত্যার শুরুর দিকে ফিলিস্তিনী এক পন্ডিত-কে বলেছিলাম যে উপমহাদেশের মুসলমানদের উপনিবেশ ও উপনিবেশোত্তর সংগ্রামের ইতিহাস থেকে তাদের অনেক কিছু শিখবার আছে। তার একটা কথা আমার মনে পড়ে। সে দাবী করেছিলো যে হামাস-কে যেনো ভাতৃসংঘের সাথে গুলিয়ে না ফেলি। বিগত দুই বৎসরেরও অধিক সময়কাল ধরে একাকী পুরো পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে হামাস তার সত্যতা জানান দিয়েছে। অনুরুপ জামায়াতে ইসলামীর সাথে একটা নির্দিষ্ট সময় পথ চলবার পরও যদি তোমাদের মনে হয় যে নতুন কিছু করবার আরও উন্নত কিছু করবার আবশ্যকতা আছে সেই সিদ্ধান্ত তোমাদের।

এখন হেলায় সময় নষ্ট করিও না। এখন দেশ গড়ার সময়। এখন একতার সময়। ইসলামের ভিত্তিতে। ঈমানের ভিত্তিতে। জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বে। আল্লাহু মুস্তাআন।

 মনে রাখবা, হয় আমরা দেশ গড়বো, নয় গোরে শকুন পড়বে।

 


Popular posts from this blog

বামাতি রাজনীতি থেকে উৎসারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বরুপ

The Politics of Funeral

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলাপ নিয়ে প্রলপন