ইসলাম ও তাগুতের দ্বন্দ্বে সহিংসতার দায়ভার কার বেশী?
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দৈন্যদশার সুলুক সন্ধান করতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়ভারের প্রশ্নটি সবার আগে থাকবে। এটিকে মূলত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেও এর শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মচারীদের মন-মানসিকতা, আচার-আচরণ, কথাবার্তায় স্পষ্ট যে এটি আসলে একটি পার্টি অফিস। বাংলাদেশের ও বাংলাদেশীয়দের অধ:গমনে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ভার হিসেব করা হলে এদের বিদ্যমানতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়ও আমি দেখেছি মুসলমান ঘরের সম্ভাবনাময় সন্তানদের এই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি করে অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দেয়। তবে এই প্রক্রিয়া যে শুধু বাংলাদেশেই বিদ্যমান ব্যাপারটা তা নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলিম রাষ্ট্র্য সমূহের ট্রোজান হর্স। এক কালে কাফির ও তাগুতি শক্তি সমূহ মুসলিম পরিবারের সন্তানদের গুম করে দারুল হরবে নিয়ে যেতো। সেখানে তাদের বিধর্মীয় শিক্ষা-সংস্কৃতিতে প্রশিক্ষিত করে পরবর্তীতে মুসলমানদের বিরুদ্ধেই তাদের লেলিয়ে দিতো। আধুনিক বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বলেই মনে করি।
কিছু দিন আগে দোহায় অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ওয়ায়িল হাল্লাক এর সাথে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মুসলিম শিক্ষার্থীদের বিতর্ক অনুষ্ঠান যেনো সেই সত্যকেই চক্ষুষ্মান করেছে। হাল্লাক একজন খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বী হয়েও ইসলাম ধর্ম ও তার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত সম্পর্কে তাঁর যে জ্ঞান-গরিমা তা মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝেও অনুপস্থিত। তাহলে সাধারণ মুসলমানদের কি অবস্থা?
সে অবস্থার-ই প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় এই মুক্তিযুদ্ধ বনাম ইসলাম কেন্দ্রিক আলোচনা। এনসিপির নেতাদের কেউই আজ পর্যন্ত নূন্যতম রাজনৈতিক ধীশক্তির প্রমাণ রাখতে পারেনি। বরং তাদের অনেকেই দেশীয় রাজনৈতিক সিলসিলায় নব্য উল্লুক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেলাম যখন দেখলাম ছাত্র শিবির নেতা সাদিক কায়েম পর্যন্ত তথাকথিত বাংলাদেশ পন্থার আলাপ দিয়ে বসলো। উপরন্তু যখন জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও মুক্তিযুদ্ধের লেবেন চুষ চাটা শুরু করেন তখন আমরা বিস্মিত হই বৈকি!
সংঘাতটাতো এ নিয়ে নয় যে জামাত মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতা মেনে নিতে চায় কিনা। তা তো তারা বহু আগেই মেনে নিয়েছে। বরং সংঘাতটাতো এই নিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধ প্রকল্পের কুশীলবেরা একাত্তোরত্তর জামাতের ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তাকে মেনে নিতে প্রস্তুত কিনা? দ্বন্দ্ব-টা এখানেই। ঠিক এই দ্বন্দ্বের জেরেই ওসমান হাদী-কে লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে বলে মনে হয়।
সুতরাং সাদিক কায়েম! বামাতি ফ্যাশনে মাথায় পট্টি বেঁধে, বটতলে কিংবা মিনার বেদিতে যতোই শপথের নামে বামপট্টির নাটুকেপনা করো প্রধান লক্ষ্যবস্তু কিন্তু তোমরাই। এনসিপির কিংবা আরো কি সব ছাপোনার পয়দা হয়েছে মূল লক্ষ্যবস্তু তারাও নয়। বরং যারা হাদীর মতো ইসলামকে সর্বাগ্রে ধারণ করে এবং একই সাথে জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্য ও জাতির উন্নয়নের রাজনীতিকে ধারণ করে তারাই হলো প্রধান লক্ষ্যবস্তু। কারন এই রাজনীতির সম্ভাবনা (potency) মুক্তিযুদ্ধের মূল অনুঘটকদের জন্য হুমকি স্বরুপ।
সেই সাথে তারাও লক্ষ্যবস্তু যারা সোনাপট্টির নটোবরদের নষ্টামির সূত্র ধরে ফেলেছে। তবে সবাই হাদির মতো আত্মঘাতী হয়ে সেই বন্দোবস্তের প্রতিটি ইঁট খুলে নেবার স্পর্ধা দেখায়নি। এই সূত্রেই সে সোনাপক্ষ ও ভারতপক্ষের মণিকাঞ্চন যোগের শিকারে পরিণত হয়েছে। কেননা তথাকথিত ডিপস্টেট না পাকিস্তানপন্থী, না ভারতপন্থী, না বাংলাদেশপন্থী। এরা উদরপন্থী। ধর্মের কথা, ইসলামীকরণের কথা বারংবার কেনো বলি, এবার বোঝ মিঞাঁরা?
সুতরাং ইসলাম পাগল জনতার কিংবা নূন্যতম পক্ষে ইসলাম বিদ্বেষ নেই এমন মানসিকতা সম্পন্ন যারাই বাংলাদেশের জনগণের একতা ও উন্নয়নের রাজনীতি ধারণ করেন তাদের অন্তত এই কথা মাথায় রাখা উচিত যে ইসলামের সাথে মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সাথে ইসলামের মাসনা-সুলাসা করলেই যে তারা সুখের সংসার গড়তে পারবেন তার কোন গ্যারান্টি নাই।
আমার ছেলেবেলায় জামাত বলয়ের যাদেরকেই দেখেছি তাদের প্রায় সকলেই জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্য ও জাতির উন্নয়ন মূলক রাজনীতির প্রবল ভক্ত-অনুরক্ত ছিলেন। তাতে কি জোট সরকারের শেষ রক্ষা হয়েছে? বরং এখন মালাউনি ল্যাঙ খেয়ে খেলা ঘুরে গেছে। একদিকে লন্ডনী ভাইয়া চুইংঙ্গামের মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিবোচ্ছেন। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধা আওয়ামী পরিবার থেকে আসা জামাইত্যা গুলো বিএনপির পেছনে নেয়ে-খেয়ে লেগেছে। জুলাই'২৪ উত্তর বিএনপি-জামাতের কামড়া-কামড়ির সূত্রটা এইবার মিলেছে তো? পুরো দেশটা একদম মুক্তিযুদ্ধের পুনাপুনিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বালো হয়েচে না বন্দুরা? আমি কি কাহারও বিরুদদে কিছু বলতেছি? কাহারও মনে কশটো দিতেছি? আমিতো বালা না, বালা লইয়া তাইক্কো!
সুতরাং জুলাই'২৪ পরবর্তীতে যে নতুন রাজনীতির আলাপ তোলা হচ্ছে তাতে নতুনত্বের কিছু নাই। যারা বলছেন যে একই সাথে মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম-কে ধারণ করতে চান, যারা বলছেন যে তথাকথিত বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি করতে চান, তাদের এই বয়ানের তাত্ত্বিক অসংলগ্নতা উপেক্ষা করা গেলেও তার প্রায়োগিক সংকট যে এড়ানো সম্ভব নয় তা স্পষ্ট।
কেননা মুক্তিযুদ্ধ প্রকল্পের উদ্যোক্তারাই ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়েছিলো। তারা জেনে বুঝেই তা করেছিলো এবং এখনও তা অব্যাহত রেখেছে। এমনকি যে দাবী সন্ত্রাসবাদের আশ্রয় নিয়ে আদায় করা হয়েছিলো সে দাবী রক্ষার প্রয়োজনে আবারও সন্ত্রাসবাদের আশ্রয় নেবার হুমকি-ধমকি পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে। ইসলামপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতার মূলে ছিলো এই সন্ত্রাসবাদের আশ্রয় নেবার বিরোধীতা। এ দেশের মানুষের স্বায়ত্বশাসনের অধিকার আদায়ের বিরোধীতা নয়।
ইসলামপন্থীরা বরঞ্চ বরাবরই অহিংস পদ্ধতিতে তাদের কার্যক্রম অর্থাৎ দাওয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম চালিয়ে যাবার পক্ষপাতি। কিন্তু তাতে অবধারিতভাবে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাগুতি শক্তিসমূহ যা উপমহাদেশে হিন্দুত্ববাদী-বামাতি রুপ পরিগ্রহ করেছে। এবং এই প্রতিবন্ধকতা তারা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই তৈরী করেনি বরং তা করেছে নৃশংস পন্থায়। সমস্যাটা এখানেই। লড়াইটাও এখানেই।
মুসলমানদের আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে এই দুনিয়াটা হলো ইসলাম ও কুফরের লড়াইয়ের ময়দান। এই লড়াইয়ের ইতিহাসে মুসলমানেরা কখনোই অমুসলিম নিধনে ব্রত হয় নাই। বরঞ্চ ইসলামের আদল, ইনসাফ ও এহসান তাগুতি-কুফরি অক্ষশক্তির যে মুষ্টিমেয় কর্তা ও গোষ্ঠী সমূহের স্বার্থ বিরোধী হয়ে উঠেছিলো তারাই মুসলমানদের বিনাশে ব্রত হয়েছে বারংবার। মরণঘাতী লড়াইয়ের সূচনাও হয়েছে সেখান থেকেই। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এ এই চিরসত্যের স্বচিত্রায়ন ঘটেছে মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহীম আ: ও তাঁর মুশরিক পিতার কথোপকথনে:
এবং এই কিতাবে উল্লেখ করুন ইব্রাহীমের ঘটনা। নিশ্চই তিনি ছিলেন একজন সিদ্দীক ও একজন নবী। যখন তিনি তাঁর পিতাকে শুধোলেন, হে আব্বাজান! আপনি কেন এমন জিনিসের বন্দেগী করেন যা না শুনতে পায়, না দেখতে পায়, না আপনার কোন কাজে আসে? হে আব্বাজান! আমি এমন জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছি যা আপনার অনবগত। অতএব আমাকে অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সহজ পথ দেখিয়ে দেবো। হে আব্বাজান! শয়তানের বন্দেগী করিয়েন না। নিশ্চই এই শয়তান খোদাদ্রোহী। হে আব্বাজান! না জানি আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার ওপর আযাব নাজিল হয়ে যায় আর আপনি হয়ে যান শয়তানের অলীদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পিতা ধমকালেন এই বলে যে, হে ইব্রাহীম! তোমার কতো বড়ো স্পর্ধা যে তুমি আমার ঠাকুরদের তাচ্ছিল্য করো? যদি তুমি এহেন কর্ম থেকে বিরত না হও, আমি তোমাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করবো। এখন দুর হও আমার চোখের সামনে থেকে। ইব্রাহীম বললেন, আপনার ওপর সালাম! আমি আমার রবের নিকট আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো। উনি আমার ব্যাপারে বড়ই রহমদীল।
মহান আল্লাহর রাজী খুশি অর্জনের প্রয়োজনে নিজের বাপ কেনো পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করাটাই ধর্মীয় রাজনীতি। আর দ্বন্দ্ব সংঘাতের মাধ্যমে নানা পক্ষের প্রতীতির (conviction) পরীক্ষা নেয়াই রাজনীতির ধর্ম।